আগোছালো করে প্রয়োজন রাখি সরিয়ে,
ভীষণ ক্লান্ত রাতঘুম দেয় তারা,
কখনো সামনে কখনো বা দূরে থেকে,
কয়টা কথার প্রত্যাশা করে কারা?

তারা জ্বলজ্বল উজ্বল করে চোখ,
এখনো মোদের শ্বাস-প্রশ্বাস শোনে।
খুঁজে পেতে নেয় আমাদের রোগশোক,
চোখের তলার কালোদাগ টিও জানে।

খোলে, ভাঁজ করে - ফেলে আসা কত কথা।
হুইলচেয়ারে দুপুর রাত্রি গোনে।
দামি রিপোর্টের ভীত সংবাদ গুলো,
পার্টির শব্দে চুপ করে থাকে কোনে।

আমাদেরই কেউ দেয়ালের ছবিটাকে,
ফিরে পেতে চায় প্রতিদিন নিয়মিত।
বেছে দেওয়া দিনে শুভেচ্ছা পোস্ট করে,
কারো বা রোজের দায়িত্ব সমাপ্ত।

এই পারফিউম আর মাছের গন্ধের ব্যাপারটা অনেকদিন ধরেই বিভীষণ খেয়াল করেছে। যখন প্রথম প্রথম দেখাসাক্ষাৎ, মেলামেশা তখন বীথী একটা সস্তা সেন্ট মাখত মাঝে মাঝে। নাক জ্বালা করত বিভীষণের, কেবিনের আলো-আঁধারিতে ফিসফ্রাই খেতে খেতে একদিন ওক করার পর আর মাখেনি। এখন অবশ্য ক্যারন, ক্লাইভ ক্রিশ্চিয়ান এসব ব্যবহার করে। বিকেলের লেখার পাট চুকিয়ে, দক্ষিনের বারান্দায় স্কচ খুলে বসলেই বেডরুম থেকে প্রবল গন্ধগুলো ভেসে আসে। মাঝে মাঝে সে উঠে গিয়ে জানলা দিয়ে বীথীকে লক্ষ্য করে, রোজ একজন মানুষ কেমন করে পরতে পরতে গায়ে গন্ধ মাখে সেটা বোঝার চেষ্টা করে। বীথী দেখতে পেলে খুশি হয়।

আজ অন্যদিনের তুলনায় গন্ধটা একটু কম দশাসই মনে হলেও, এই বারান্দার চেয়ার ছেড়ে ওঠা যাবে না। আজ অন্তত দুম করে হঠকারী চিন্তাভাবনার দিন নয়। সামনে একটা অর্ধসমাপ্ত প্রবন্ধ, পাশে একটা ঈষৎ উষ্ণ স্মার্টফোন। একটা বিরুদ্ধ প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে প্রকাশ সিনহার কেসটা নিয়ে। প্রকাশ সিনহা এমনিতে বেশ কারিগর লোক, কিন্তু আজকের পনেরো মিনিটের কথোপকথনে মনে হল যেন বেশ ভয় পেয়েছে। এমতাবস্থায়, জনচেতনার শহুরে অংশের চোখে একটা উল্টোমত, সিনহার একটা নিরাপরাধ, বেচারি মুখটার প্রতিষ্ঠা করে দিতে হবে। আজ রাতের মধ্যে ড্রাফটা বানিয়ে আনন্দবাজারের রায়কে আবার একবার ধরতে হবে। আজকে আর ছাড়া যাবে না, কমিট করিয়ে নিতে হবে। যদি লেখাটা মাপজোক মত বের করা যায় তাহলে একাডেমীতে প্রভাব-ট্রভাব তো একদিকে বাড়বেই, জোকা-তে সাহিত্য ভবন তৈরীর কাজটাও শুরু করে দিতে পারা যাবে।

বিভীষণের আসল নাম বিভাস সেন, কিন্তু বিভাস নামে বহুদিনই তাকে কেউ ডাকে না। অমর্ত্য সংলাপ প্রকাশ হয়েছিল আজ থেকে ষোল বছর আগে। সেই থেকেই বিভাস সেনের পাট চুকেছে। অমর্ত্য সংলাপ লেখা বন্ধুদের সঙ্গে বাজী রেখে, অতীনের পরামর্শ মত ছদ্মনামে। এরপর দুটো বছর খান দশেক গল্প, তারপর সরাসরি দেশে শারদীয়ায় উপন্যাস। বীথীর বাড়িতে প্রস্তাব দিলে ওর দত্ত ব্রাদার্সের কর্মচারী বাবা সাইকেল চালিয়ে গিয়ে খুব প্রসিদ্ধ দোকানের মিষ্টি কিনে নিয়ে এসেছিল। হাতিবাগানের সেই ঘুপচি ঘরে সেদিন অবশ্য বীথী আবার সেই সেন্টটা মেখেছিল।

মাছের গন্ধের সমস্যার শুরু তার আরো বছর দুয়েক পর। অনিল সরকার ভারতীতে চাকরির খবর নিয়ে এলেন, বেশ ভালো মাইনে, লেখালিখির প্রবাহ একটু কমবে কিন্তু তখন ওখানে প্রখ্যাত লেখক সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় কাজ করেন, তাঁর বৃত্তে ঘোরাফেরা করার সুফল অনেক। এই অযাচিত সুবিধের জন্য অনিল সরকারের একটা চাহিদা ছিল, এমনিতে খুব সামান্য চাহিদা কিন্তু তাঁর জন্য বিভাসকে শেষবেলায় গিয়ে অরুন্ধতীর প্রকাশককে গাড্ডায় ফেলতে হবে পূজোর লেখা না দিয়ে। চুক্তি মৌখিক, প্রকাশক বড়জোর একটা মামলা করতে পারে, সেটা অনিলের লোক সামলাবে। এতে ভারতীর আর বিভাসের দু’পক্ষেরই লাভ অপরিসীম। এসমস্ত কথা হচ্ছিল কসবার একটা ভাড়াবাড়ির ছোট্ট বারান্দায় বসে। কদিন গুমোটের পর সেদিন সকাল থেকে বৃষ্টি হয়েছে, অনিল সরকার ক্রমশঃ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছেন, আর বিভাস দেখতে পেল গলির মোড় দিয়ে নালু বাজারের ব্যাগ নিয়ে এদিকেই আসছে। নালুর আসাটা দেখে বিভাসের তখনই একেবারে পছন্দ হয়নি, নালু আদ্যন্ত মাছের গন্ধ নিয়ে কাদামাখা পায়ে বিভাসের খুব দরকারি বারান্দায় উঠে এসেছিল। বীথী খুব আনন্দ করে ইলিশ রান্না করতে করতে বলেছিল, কাল কালিঘাট হয়ে একবার বাড়ী যাব। বিভাসের কিছু করার ছিল না, নালুর কথামত চললে সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরাসরি প্রতিপক্ষে চলে যাওয়া-টাওয়া সেসব তো আছেই, তা ছাড়াও চাকরি বাকরি না করে খালি লেখা লিখে সংসার চালানোর এই ভয়ঙ্কর রাস্তাতেও নেমে পড়তে হয়। নালু বৃষ্টির বিকেলে বাচ্চাদের সঙ্গে মাঠে ফুটবল খেলে, বাজার থেকে সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ইলিশ মাছ কিনে এনে, রাত্রে লিখতে বসার আইডিয়া দিতে পারে, কিন্তু সেটা বেজায় অনিশ্চিত আইডিয়া। খালিপেটে কালজয়ী উপন্যাস লেখা লিখতে গেলে নালুর মত ডাকাবুকো হতে হবে।

নালু যে আজকেও আসছে সেটা ওর নিশ্চিত ষড়যন্ত্র। বীথী অনেকদিন পরে আজ একটা মৃদু পারফিউম মেখেছে সেটাকে উপভোগ করতে দেবে না, প্রবন্ধ লেখাটাও ভেস্তে যেতে পারে। বিভীষণ খুব আস্তে করে চোখ তুলে, যেন এইমাত্র ভাতঘুম দিয়ে উঠল সেরকম ভীষণ একটা ম্যাড়মেড়ে চোখ তুলে নালুর দিকে তাকিয়ে বসে থাকল। নালু রোগা হয়ে গেছে খুবই, একটু কুঁজোও হয়েছে। আলপটকা এখানে সেখানে পা ফেলে ফেলে হেঁটে আসছে। নালু আসছে মানেই ফুটপাত থেকে কিছু শাক সবজি কিনে আনছে, মরসুমের সেরা সবজি নাকি ফুটপাতেই থাকে। আজকাল মাছ-টাছ আর আনতে পারে না। কিন্তু নালু আসলেই বিভীষণ অবিকল মাছের গন্ধ পায়। তারপর বীথী আসে পারফিউম মেখে। তারপরই বিভীষণের বমি পায়। কিন্তু নিজের বৌ-এর প্রসাধন আর আদর্শবান পুরুষের মেশানো গন্ধে, একটা খুব দরকারি কাগজের সামনে বসে অত সহজে বমিও তো করে ফেলতে পারা যায় না। নিজেকে সংযত করে বিভীষণ বলে, নালু তুমি আগে অনুকে রান্নাঘরে ওই ব্যাগে কি এনেছ সেটা দিয়ে এসো। আর একটু চা করতে বল তো। নালু উদ্ধতভাবে বলে, চা আর কি করে খাবেন। যা খাচ্ছেন তাই খান। বিভীষণ কিছু মনে করে না। নালু বরাবরই এরকম, রাগী, গোঁয়ার। যাক ও রান্নাঘরে গিয়ে অনুর সঙ্গে নানা দুঃখ, দুর্দশার কথা আলোচনা করতে করতে চা-টা খাক। এদিকে না এলেই হল, লেখাটা সময়মত নামাতে হবে।

প্রকাশ সিনহা আর বিভীষণের বহু আকাঙ্ক্ষিত সাহিত্য ভবন কিরকম জড়ামড়ি করে রয়েছে সেটা ভেবে একটু হাসিই পেল বিভাসের। সস্তা, সেরা সব্জীর ক্রেতা নালু এসব শুনলে আবার কি বলবে কে জানে। বাবার সম্পত্তির অংশ বেচে মৌলালির সেই কমিউনিস্ট ছোকরাদের সাহিত্য সংগঠনকে কিভাবে দাঁড় করিয়েছে সেসব উদাহরন দেবে মনে হয়। টাকার যোগাড়ের জন্য নিজের বইয়ের কমপ্লিমেন্টারি কপি চেয়ে এনে বিক্রি করে যে লোক, সে কি করে এসব পাঠ্যপুস্তক মার্কা সমাজসেবা করে বেড়ায় কে জানে। কিন্তু তার চেয়েও যেটা আশ্চর্যের সেটা হল নালুর মত লোক বিভীষণের বাড়ী আসে, এসে আবার নানা উপদেশ দেয়।

বীথী রেডি হয়ে গেছে, এবার নগর সৌন্দর্যায়নের একটা এনজিও-র মিটিং-এ যাবে। বীথী এসে সামনের সোফাটায় বসল, বিভাসের অনেকদিনের স্বপ্নের মত। সামনে সাজানো লেখার সরঞ্জাম, সামনে বীথী সেজেগুজে বসে আছে, একটা জরুরী মিটিং এ যাবে। এরকম সফল স্বপ্ন তো বিভাস দেখত সেই কবে থেকে। আর আজ বিভীষণ আর বীথী সেখানে বসে আছে। হালকা একটা পারফিউম মেখেছে আজ বীথী। বিভীষণের মনে হল জিজ্ঞাসা করে, আজ কোন স্পেশাল দিন কি না। কিন্তু বীথীর একটানা হাসি হাসি মুখ দেখে বিভীষণের কেমন যেন ঘোর কেটে গেল, হঠাৎ প্রশ্ন করল, বীথী তুমি আসল তো? বীথী হো হো করে হেসে উঠল। বলল, তোমার মনে আছে, শ্যামবাজারে একদিন বাস ফাঁকা হয়ে যেতে তুমি আমার পাশে বসে, হাতটা ঠেকিয়ে বলেছিলে, অনু তুমি আসল তো? বিভীষণ প্রচণ্ড চমকে গেল। রান্নাঘর থেকে নালুর হাসি শোনা যাচ্ছে। নালু খুব কম হাসে, কিন্তু আজ এরকম হাসছে কেন। মনে হচ্ছে যেন নালু খুব খুশি। বিভীষণ বীথীর দিকে অবাক চোখে তাকাতে তাকাতে উঠে পড়ল, ব্যাপারটা কি সেটা জানতে হবে। রান্নাঘরে একটা টিমটিমে বাল্ব জ্বলছে, পারফিউমের দামি গন্ধ আর নেই, তার বদলে রান্নাঘর থেকে একটা খুব ভালো শাক ভাজার গন্ধ আসছে। বিভীষণ শুনতে পেল, নালু হাসতে হাসতে বলছে, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আর তুমি যেন তারপর কি বলেছিলে? ভীষণ আগ্রহে বিভীষণ রান্নাঘরে দরজার একদম কাছে পৌঁছে ভিতরে সন্তর্পণে উঁকি দিল। নালু রান্নাঘরের মেঝেতে বসে আছে, অনু একটা পিড়ির উপর বসে রান্না করছে। চারদিকে দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট। এ তো বিভীষণের রান্নাঘর হতে পারে না। বিভীষণ বীথীর দিকে ঘুরে দেখল, চারদিকে আঁধার ঘনিয়েছে। দেয়াল থেকে প্লাস্টার খসে যাওয়া মলিন এক চিলতে বারান্দায়, গ্রিলে একটা শাড়ি শুকাচ্ছে। বীথীর চিহ্নমাত্র নেই। রান্নাঘর থেকে অনু বলল, আমি তো তখন তোমাকে তোমার ভালো নামে ডাকতাম, আমি হেসে ফেলে বলেছিলাম, বিভাসদা তুমি পাগল না তো?

বিভীষণ চিৎকার করে, ক্ষোভে ফেটে পড়ে, দেয়ালে মাথা ঠোকে, প্রতিবাদ করে। তারপর সব শান্ত হয়ে গেলে বিভীষণ নালুর কাছে এই সমস্ত অব্যবস্থার জবাব চায়।

আমি সবে দেখলাম বাগান ও ফুল।
দীর্ঘদিন এ উদ্যানে থেকে,
নানা প্রশ্রয়, নানা অভয়বাণী শুনে,
অল্প করে চোখ খুলে দেখলাম - বাগান এবং সতেজ ফুল।
আমি দেখলাম আমাকে পরিপাটি করে ঘিরে রাখা আছে,
ছুঁচোরা আমার গায়ের গন্ধ পাচ্ছে না ।
আমার চারধারে সাজানো দারুণ নরম গল্প।
আমি প্রাণভরে কয়েক দমক শ্বাস নিয়ে নিলাম।

কিন্তু বাতাস আমার শরীরে ঢুকল না,
আমার ফুসফুসের তলা কাটা -
আমি ঠিক এটাই ভুলে যেতে চাইছিলাম।
নানা নিরাপত্তা, সুন্দর দৃশ্য, প্রেম, মানবিকতা,
নানা বই, ধর্ম, ভাষা, খাদ্য,
নানা কেরিয়ার, বিয়ে, শিশু,
নানারকম মনভুলানো বিষয় নিয়ে মেতে থেকে -
আমি এই সর্বনাশা কাটা ফুসফুসটার কথা ভুলে থাকতে চাইছিলাম।

আমি তো চেয়েছিলাম তুচ্ছ বিষয় নিয়ে দাঙ্গা হোক,
আমি চেয়েছিলাম আমার পাড়ায় বাইরের লোক ঢুকবে না,
আমি চেয়েছিলাম আত্মা, পরমাত্মা নিয়ে সোসাইটি হোক,
আমি চেয়েছিলাম আমরা সবাই হাতে হাত ধরে গান গাই।
আমি তো প্রাণপণে চোখ বন্ধ করে রাখতেই চেয়েছিলাম।

আমি আজও সমস্যাটা নিয়ে লিখছি ফেশবুকে, ব্লগে।
জানি, এতে আমাকে আমার সুন্দর বাগান থেকে কেউ সরাতে চাইবে না ।
আমি অক্ষত থেকে যাব। আমার প্রতিবাদ হোক, বা যন্ত্রণা -
নিরাপদ থেকে যাবে।
কিন্তু, এও সঙ্গোপনে জানি, আমার মাথায় ঘুন ধরে গেছে,
এ নরক থেকে আমার নিস্তার নেই!

(ভয়ানক ভয়ানক, লাগাতার বাজে, বিশ্রী খবর পড়ে এইসব নিরাপদ লেখার বিলাসিতা করলাম। সেই মানুষটির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, যিনি বলেছিলেন, কি করব, আমি তো ভালো ভালো কথাই ভাবতে চাই, বলতে চাই, লিখতে চাই, কিন্তু যা নিয়েই কথা বলতে বসি তাতেই দেখি জোচ্চুরি আর নোংরামি।)

সম্প্রতি Vimeo মজা করে একটা ট্রেলার বানাতে বলেছিল, এমন ভাবে যেন একটা সিনেমা বা টিভি সিরিজ আসতে চলেছে। বিষয়বস্তু ছিল মনের ইচ্ছে। তো দুজন লোককে পাকড়াও করে এই ৪৩-৪৪ ডিগ্রী গরমের হরিয়াণাতে সেই মজায় অংশ নিয়ে ফেললাম। নষ্ট করার সময় না থাকলে তো আমার এই লেখা কেউ পড়বে না, তাই আরো সময় নষ্ট করার সুযোগ করে দিতে নিচে ট্রেলারটা পোস্ট করে দিলাম।



সদাশিব আর অর্পিতা হলো দুই গিনিপিগ। বেচারাদের সকাল সাড়ে পাঁচটায় কল টাইম দিয়েছিলাম! কিচ্ছু ব্রেকফাস্ট যোগাড় করে দিইনি। তারপর রোদে চেয়ার পেতে বসিয়ে, জঙ্গলে হাঁটিয়ে, নানা ড্রেস পাল্টে, চল্লিশ বার একই কথা বলিয়ে বলিয়ে দুপুরে, যা একটু জিরিয়ে নে - বলে, সন্ধ্যেতে আবার ডাবিং। ওরা রকমসকম দেখে হাসছিল, আপনারা পড়তে পড়তে হাসছেন (অবশ্য কেউ আদৌ পড়ছে কি না কে জানে, যাক গে), আর আমি মনে মনে হাসছি। সামনা সামনি ভীষনই গম্ভীর আর দারুণ বুদ্ধিজীবী মত মুখ করে ঘুরছিলাম অবশ্য। না হলে ব্যাপারটা শেষ করা যেত না। 

আমি ব্যালকনিতে বসে পা দোলাচ্ছিলাম, অর্পিতা এসে বলল, অনীকদারা কেরালা ঘুরতে যাচ্ছে। হানিমুনে। দারুণ জায়গা, কি বল? কোথায় কোথায় যাচ্ছে ? মুন্নার আর কোদাইকানাল। যাবি? 
কিছুটা সময় আমার প্রাপ্য ছিল। অনীকদা অবশেষে বিয়ে করল, নিশ্চিন্তে হানিমুনে যাবে, এর সঙ্গে 'যাবি' কথাটার কি যোগ? চোখ পাকিয়ে ফেলেছি দেখে তাড়াতাড়ি বলল, অনীকদা যেতে বলেছে। বলেই নিশ্চিন্তে বসে পড়ল। আমি অনীকদাকে ফোন লাগালাম, এ কি শুনছি? সে সর্বদাই ঋষিসুলভ ঠান্ডা মানুষ। আস্তে করে বলল, হ্যাঁ, আমিই অর্পিতাকে বললাম, তোরাও গেলে ভাল হয়। অবশ্য তোদের মুন্নার আগে দেখা। কি করবি? যেতে, ছুটি-ফুটি পেতে বোধহয় অসুবিধা হবে, না ? 
এ কি রকম ব্যাভার, কোথায় আমি অসুবিধার প্রসঙ্গ-টসঙ্গ তুলব তা নয়, এতো উল্টোচাপ! ভীষণ রেগে গিয়ে, এরপর আমি তোমাদের হানিমুনে আমরা হংসমধ্যে বকযথা কেন, আর একবার ভেবে দেখ, এসব কিছুই বলতে পারলাম না। ফোন সেরে এসে ল্যাপটপ খুললাম, টিকিট ও হোটেল বুকিংটা চটপট করে ফেলতে হবে। অর্পিতা অবশ্য প্রায়শই বলে যে, ল্যাপটপ খোলার সময় আমার মুখটা নাকি বেশ হাসি হাসিই লাগছিল। আমি যদিও কোনদিনই সেটা বিশ্বাস করিনি। 
আমরা থাকি দিল্লী থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, জয়পুরের রাস্তায়। সকাল সাড়ে পাঁচটার ফ্লাইট, তিনটের সময় বেরোতে হবে। যারা বেলা নটায় ওঠে তারা বুঝবে এটা কি ভয়ংকর বিষয়। না, তিনটের সময় ওঠা নয়, দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়া। ভীষণ ভাবে সব ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠবে, ফ্যানটা বড্ড গোঁ-গোঁ করছে, পাশের বাড়ীতে শব্দ করে বাসন ধুচ্ছে, ওফ, হাচিকো চেঁচাতে শুরু করল, হাচিকো থামল, একটা বাচ্চা কেঁদে উঠল। এইসব শুনতে ক্রমশ মাথা গরম হয়ে উঠবে, আর মনে পড়ে যাবে, কাল মিনত্রা থেকে ক্যাশ অন ডেলিভারী আসবে, কাউকে টাকা দিয়ে যাবার কথা মনে রইল না, স্যার বলেছিল, তোমার কাজ হয়ে গেলে পেন ড্রাইভটা আমার টেবিলে রেখে দিও, সেটা প্যান্টের পকেটে পড়ে আছে - ইত্যাদি হাজারো ঝঞ্ঝাট। শেষে দুটো নাগাদ চোখটা লেগে আসবে, আর আড়াইটেয় ট্যাং ট্যাং করে অ্যালার্ম বেজে উঠবে।
প্লেনে উঠে একঘণ্টা সময় জোর ঘুমিয়ে নিলাম। এদের তো দরজা-টরজা বন্ধ করে, আকাশে উঠে, সুস্থির হয়ে, খাবার ট্রলি করে মাঝের রো পর্যন্ত আনতে আনতে প্রায় একঘণ্টা লেগে যায়। আবার বিনে পয়সার খাবার নয়, তাই ঘুমিয়ে পড়লেও নিশ্চয় একটু জোরে ডেকে ঘুমটা ঠিক ভাঙিয়ে দেবে। দিলও তাই। গপগপ করে আমি উপমা আর অর্পিতা ওটস খেয়ে আবার হেলে গেলাম। কোচি আসবার আগে অবশ্য কি করে দুজনেরই ঘুমটা ভেঙ্গে গেছিল। একটা নদী পেরলাম, দু পার জুড়ে নারকোল গাছের সারি, জল থই থই সবুজ মাঠ, আর দুম করে সেই মাঠে প্লেনটা নেমে পড়ল। এরকম একটা সুন্দর খোলা এয়ারপোর্ট খুব একটা দেখা যায় না। এয়ারপোর্টের বাড়িটাও একতলা একটা ছিমছাম কটেজের মত। প্লেন থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে ঢুকে গেলাম। 
বাইরে সাদা ধুতি, পরিস্কার করে কামানো গাল, পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল, কপালে তিলক - আমাদের ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে চলল কথামঙ্গলমের দিকে। আবারও ঘুমিয়ে পড়তে কসুর করলাম না। একদম কথামঙ্গলম বাসষ্টেশনের সামনে নামিয়ে বলল, আর কিছু উপকার করতে পারি কি? আমরা কিছু বলতে না পেরে, অভিভূত হয়ে বাসষ্টেশনে ঢুকে গেলাম। ফাঁকা বাস ধীরে ধীরে ভরে গেল, পাহাড় এসে গেল, তাল তাল মেঘ ঘন হয়ে এল, শোঁ-শোঁ করে বৃষ্টি পড়তে লাগল। আমি যে আমি, পাহাড়ে গেলেই ওয়াক ওয়াক করি, সে পর্যন্ত জানলার খড়খড়ি অল্প ফাঁক করে, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। বর্ষায় পশ্চিমঘাট যে কি, সে বর্ণনা আমি করতে পারব না। বর্ষায় চেরাপুঞ্জি আমি গেছি। সর্ব শক্তি দিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় সেখানে অমোঘ।
বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস দুয়ার চেপে ধরে
কিন্তু, পশ্চিমঘাটে যেন অসংখ্য ছেঁড়া পর্দা, কখনো ভারী, কখনো পাতলা- ছিট কাপড়ের। চেরাপুঞ্জির মত নরম পলকা আঁচল দিয়ে সব সময় ঢেকে নেই। চোখ ঢেকে যাচ্ছে বৃষ্টিতে, অথচ ওরই ফাঁকে দেখতে পাচ্ছি, সামনের ঢালু সবুজ পাহাড়টায় তীব্র একফালি রোদ এসে পড়েছে। এপাশটায় কালচে নীল, ওপাশে কলার হলুদ আর কলাপাতার সবুজ মিলে মাতামাতি করছে। আমরা সাদা পেঁজা তুলোর মত মেঘের ছবি দেখছি, নিচে বাড়ীর ছাদে দাঁড়িয়ে বাচ্চা মেয়েটা দূরের পাহাড়টার পিছনে ধোঁয়া কালো সমুদ্রের ঢেউ এগিয়ে আসছে দেখছে।



এ জিনিস দেখার শেষ নেই, বাস এসে মুন্নারে দাঁড়িয়ে গেল। আমরা ওপর থেকে চুপচুপে ভেজা, ভিতর থেকে ঝরঝরে ফানুসের মত দুজন যেন সদ্য ঘুম থেকে ওঠা, দু চোখে লেগে থাকা আবেশ নিয়ে ছোট্ট হোটেলটার দিকে এগিয়ে চললাম। এই ছোট্ট হোটেল, গ্রীন ভিউ - হলিডে ইন-এ আমরা আগের বারও ছিলাম। হোটেলটা মুন্নার বাজার অঞ্চল থেকে এক কিলোমিটার দূরে, পাহাড়ের গায়ে, নির্জনে। যাঁরা হোটেল চালান, তারা দারুন ভালো মানুষ। তাই এবারে আর অন্য কোথাও বুকিংয়ের চেষ্টাও করিনি।
হোটেলে ঢুকে শুনি অনীকদারা আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারা পৌঁছেছে কালকে। আমরাও চটপট বেরিয়ে পড়লাম। এখন যদি চান করে ভাত খাই তাহলে কোনো পাহাড় আমাকে বিছানা থেকে তুলতে পারবে না। বৃষ্টির কলকল করে রাস্তা ছাপানো জল থইথই করতে করতে আমরা একটু এগিয়ে দেখি অনীকদারা এসে নামল। বলে, চল লাঞ্চটা করে নিই। সে কি, তিনটে বাজে তোমরা এখনও খাওনি? ভাত খাবোনা খাবনা করেও, অতঃপর সেই ভাত, চার পাঁচ পদের নানা তরকারি, মাছভাজা সহযোগে লাঞ্চ করে হাই তুলতে তুলতে ছাতা মাথায় বাইরে এসে দাঁড়ালাম। বৃষ্টি তখন একটু ধরেছে। সামনেই একটা ইকো পার্কে বেড়াতে যাওয়া হল। মাটুপেত্তি, কুন্দালা, সার সার নয়ানভিরাম চা বাগান আমাদের আগেই ঘোরা, কালকে আজকে মিলিয়ে অনীকদারাও ঘুরে নিয়েছে, সুতরাং চল প্যান্ট গুটিয়ে, জোঁকের আতঙ্কে শিহরিত হতে হতে ইকো 'থিম' পার্ক। সাজানো আদিম পরিবেশ করার চেষ্টা হয়েছে, বৃষ্টি না পড়লে, বিকেল বেলায় গুচ্ছের চ্যাঁ-ভ্যাঁর মধ্যে সেই আদিমতা কতটা পাওয়া যেত জানি না, কিন্তু এই যে কুলকুল করে বৃষ্টির জল, ক্রমে ঝড়ঝড় করে, স্রোতের মত খলবল করে, মাঠ ডুবিয়ে, পা মাড়িয়ে চলছে, গাছের গোড়ায় ঝিঁঝিঁ ডাকছে, চারদিকে প্রাণীটি নেই, বিশাল বিশাল গাছের গুঁড়িরা মেঘের সঙ্গে মিলে অন্ধকার ঘনিয়ে এনেছে - এ দেখে আমাদের মন ভাল হয়ে গেল।
ফিরে এসে ড্রাইভারজীকে বললাম আত্তুকালটা টপ করে ঘুরে আসা যায় না। তিনি সানন্দেই  গেলেন। যাবার সময় এক জায়গায় থেমে ছিলাম আগেরবার। সেখান থেকে একটা চা বাগানের মধ্যে দিয়ে গিয়ে আত্তুকাল জলপ্রপাতের দারুন একটা দৃশ্য দেখেছিলাম। এবারও সেটা করার জন্য বলে শুনলাম, ওখানটা বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে একটু দূর থেকে একটা জায়গায় দুধের জায়গায় ঘোল পাওয়া যাবে। সেটাও মন্দ নয়।


জলপ্রপাতের ঠিক পাশে একটি বাড়ি আছে, তাঁরাই সামনেটাতে একটা চা কফির দোকান করেছেন, গতবারে টাইগার বলে একজন কুকুর শ্রেনীর জীবের সঙ্গে সেখানে আলাপ হয়েছিল। এবারে গিয়ে শুনলাম, টাইগার মারা গেছে। জলপ্রপাতের সামনে তো কিছু কথা বলা বা শোনা যায় না, তাই টাইগার আগেরবার কেমন বিস্কুট খাবার জন্য সবার সামনে দিয়েই গুঁড়ি মেরে লুকিয়ে লুকিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, সে সব নানা ভাবনায় ছেদ পড়তে পারল না। কিছুক্ষণ বসে বসে বর্ষাকালের আত্তুকালের মনমোহিনী দেখে কুয়াশায় কালচে নীল পথ পেরিয়ে হোটেলে চলে এলাম।


এই যে শোঁ-শোঁ করে সময় চলে যাচ্ছে, আমরা অসহায়ের মত শুধু দেখছি আর দেখছি, এ জিনিস এক জায়গায় বেশ কিছু বছর পর আবার আসলে বেশ বোঝা যায়। দেখার চোখে যত ঘনায় ছানির অমাবস্যা, তত বাড়ে দেখার ক্ষমতা, যত কাঁধ ঝুঁকে আসে, তত স্পষ্ট করে মাটিটা চিনতে পারা যায়, তারপর কোটি কোটি অসংখ্য প্রানের মত, টাইগারের মত, সব বোকামো, বুদ্ধি, হিংসা, ধর্ম এখানে ফেলে চলে  যেতে হয়। নিঃশব্দে! 
 
অবসরে । ২০১৪ ।