আমি ব্যালকনিতে বসে পা দোলাচ্ছিলাম, অর্পিতা এসে বলল, অনীকদারা কেরালা ঘুরতে যাচ্ছে। হানিমুনে। দারুণ জায়গা, কি বল? কোথায় কোথায় যাচ্ছে ? মুন্নার আর কোদাইকানাল। যাবি?
কিছুটা সময় আমার প্রাপ্য ছিল। অনীকদা অবশেষে বিয়ে করল, নিশ্চিন্তে হানিমুনে যাবে, এর সঙ্গে 'যাবি' কথাটার কি যোগ? চোখ পাকিয়ে ফেলেছি দেখে তাড়াতাড়ি বলল, অনীকদা যেতে বলেছে। বলেই নিশ্চিন্তে বসে পড়ল। আমি অনীকদাকে ফোন লাগালাম, এ কি শুনছি? সে সর্বদাই ঋষিসুলভ ঠান্ডা মানুষ। আস্তে করে বলল, হ্যাঁ, আমিই অর্পিতাকে বললাম, তোরাও গেলে ভাল হয়। অবশ্য তোদের মুন্নার আগে দেখা। কি করবি? যেতে, ছুটি-ফুটি পেতে বোধহয় অসুবিধা হবে, না ?
এ কি রকম ব্যাভার, কোথায় আমি অসুবিধার প্রসঙ্গ-টসঙ্গ তুলব তা নয়, এতো উল্টোচাপ! ভীষণ রেগে গিয়ে, এরপর আমি তোমাদের হানিমুনে আমরা হংসমধ্যে বকযথা কেন, আর একবার ভেবে দেখ, এসব কিছুই বলতে পারলাম না। ফোন সেরে এসে ল্যাপটপ খুললাম, টিকিট ও হোটেল বুকিংটা চটপট করে ফেলতে হবে। অর্পিতা অবশ্য প্রায়শই বলে যে, ল্যাপটপ খোলার সময় আমার মুখটা নাকি বেশ হাসি হাসিই লাগছিল। আমি যদিও কোনদিনই সেটা বিশ্বাস করিনি।
আমরা থাকি দিল্লী থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, জয়পুরের রাস্তায়। সকাল সাড়ে পাঁচটার ফ্লাইট, তিনটের সময় বেরোতে হবে। যারা বেলা নটায় ওঠে তারা বুঝবে এটা কি ভয়ংকর বিষয়। না, তিনটের সময় ওঠা নয়, দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়া। ভীষণ ভাবে সব ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠবে, ফ্যানটা বড্ড গোঁ-গোঁ করছে, পাশের বাড়ীতে শব্দ করে বাসন ধুচ্ছে, ওফ, হাচিকো চেঁচাতে শুরু করল, হাচিকো থামল, একটা বাচ্চা কেঁদে উঠল। এইসব শুনতে ক্রমশ মাথা গরম হয়ে উঠবে, আর মনে পড়ে যাবে, কাল মিনত্রা থেকে ক্যাশ অন ডেলিভারী আসবে, কাউকে টাকা দিয়ে যাবার কথা মনে রইল না, স্যার বলেছিল, তোমার কাজ হয়ে গেলে পেন ড্রাইভটা আমার টেবিলে রেখে দিও, সেটা প্যান্টের পকেটে পড়ে আছে - ইত্যাদি হাজারো ঝঞ্ঝাট। শেষে দুটো নাগাদ চোখটা লেগে আসবে, আর আড়াইটেয় ট্যাং ট্যাং করে অ্যালার্ম বেজে উঠবে।
প্লেনে উঠে একঘণ্টা সময় জোর ঘুমিয়ে নিলাম। এদের তো দরজা-টরজা বন্ধ করে, আকাশে উঠে, সুস্থির হয়ে, খাবার ট্রলি করে মাঝের রো পর্যন্ত আনতে আনতে প্রায় একঘণ্টা লেগে যায়। আবার বিনে পয়সার খাবার নয়, তাই ঘুমিয়ে পড়লেও নিশ্চয় একটু জোরে ডেকে ঘুমটা ঠিক ভাঙিয়ে দেবে। দিলও তাই। গপগপ করে আমি উপমা আর অর্পিতা ওটস খেয়ে আবার হেলে গেলাম। কোচি আসবার আগে অবশ্য কি করে দুজনেরই ঘুমটা ভেঙ্গে গেছিল। একটা নদী পেরলাম, দু পার জুড়ে নারকোল গাছের সারি, জল থই থই সবুজ মাঠ, আর দুম করে সেই মাঠে প্লেনটা নেমে পড়ল। এরকম একটা সুন্দর খোলা এয়ারপোর্ট খুব একটা দেখা যায় না। এয়ারপোর্টের বাড়িটাও একতলা একটা ছিমছাম কটেজের মত। প্লেন থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে ঢুকে গেলাম।
বাইরে সাদা ধুতি, পরিস্কার করে কামানো গাল, পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল, কপালে তিলক - আমাদের ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে চলল কথামঙ্গলমের দিকে। আবারও ঘুমিয়ে পড়তে কসুর করলাম না। একদম কথামঙ্গলম বাসষ্টেশনের সামনে নামিয়ে বলল, আর কিছু উপকার করতে পারি কি? আমরা কিছু বলতে না পেরে, অভিভূত হয়ে বাসষ্টেশনে ঢুকে গেলাম। ফাঁকা বাস ধীরে ধীরে ভরে গেল, পাহাড় এসে গেল, তাল তাল মেঘ ঘন হয়ে এল, শোঁ-শোঁ করে বৃষ্টি পড়তে লাগল। আমি যে আমি, পাহাড়ে গেলেই ওয়াক ওয়াক করি, সে পর্যন্ত জানলার খড়খড়ি অল্প ফাঁক করে, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। বর্ষায় পশ্চিমঘাট যে কি, সে বর্ণনা আমি করতে পারব না। বর্ষায় চেরাপুঞ্জি আমি গেছি। সর্ব শক্তি দিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় সেখানে অমোঘ।
বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস দুয়ার চেপে ধরে
কিন্তু, পশ্চিমঘাটে যেন অসংখ্য ছেঁড়া পর্দা, কখনো ভারী, কখনো পাতলা- ছিট কাপড়ের। চেরাপুঞ্জির মত নরম পলকা আঁচল দিয়ে সব সময় ঢেকে নেই। চোখ ঢেকে যাচ্ছে বৃষ্টিতে, অথচ ওরই ফাঁকে দেখতে পাচ্ছি, সামনের ঢালু সবুজ পাহাড়টায় তীব্র একফালি রোদ এসে পড়েছে। এপাশটায় কালচে নীল, ওপাশে কলার হলুদ আর কলাপাতার সবুজ মিলে মাতামাতি করছে। আমরা সাদা পেঁজা তুলোর মত মেঘের ছবি দেখছি, নিচে বাড়ীর ছাদে দাঁড়িয়ে বাচ্চা মেয়েটা দূরের পাহাড়টার পিছনে ধোঁয়া কালো সমুদ্রের ঢেউ এগিয়ে আসছে দেখছে।
এ জিনিস দেখার শেষ নেই, বাস এসে মুন্নারে দাঁড়িয়ে গেল। আমরা ওপর থেকে চুপচুপে ভেজা, ভিতর থেকে ঝরঝরে ফানুসের মত দুজন যেন সদ্য ঘুম থেকে ওঠা, দু চোখে লেগে থাকা আবেশ নিয়ে ছোট্ট হোটেলটার দিকে এগিয়ে চললাম। এই ছোট্ট হোটেল, গ্রীন ভিউ - হলিডে ইন-এ আমরা আগের বারও ছিলাম। হোটেলটা মুন্নার বাজার অঞ্চল থেকে এক কিলোমিটার দূরে, পাহাড়ের গায়ে, নির্জনে। যাঁরা হোটেল চালান, তারা দারুন ভালো মানুষ। তাই এবারে আর অন্য কোথাও বুকিংয়ের চেষ্টাও করিনি।
হোটেলে ঢুকে শুনি অনীকদারা আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারা পৌঁছেছে কালকে। আমরাও চটপট বেরিয়ে পড়লাম। এখন যদি চান করে ভাত খাই তাহলে কোনো পাহাড় আমাকে বিছানা থেকে তুলতে পারবে না। বৃষ্টির কলকল করে রাস্তা ছাপানো জল থইথই করতে করতে আমরা একটু এগিয়ে দেখি অনীকদারা এসে নামল। বলে, চল লাঞ্চটা করে নিই। সে কি, তিনটে বাজে তোমরা এখনও খাওনি? ভাত খাবোনা খাবনা করেও, অতঃপর সেই ভাত, চার পাঁচ পদের নানা তরকারি, মাছভাজা সহযোগে লাঞ্চ করে হাই তুলতে তুলতে ছাতা মাথায় বাইরে এসে দাঁড়ালাম। বৃষ্টি তখন একটু ধরেছে। সামনেই একটা ইকো পার্কে বেড়াতে যাওয়া হল। মাটুপেত্তি, কুন্দালা, সার সার নয়ানভিরাম চা বাগান আমাদের আগেই ঘোরা, কালকে আজকে মিলিয়ে অনীকদারাও ঘুরে নিয়েছে, সুতরাং চল প্যান্ট গুটিয়ে, জোঁকের আতঙ্কে শিহরিত হতে হতে ইকো 'থিম' পার্ক। সাজানো আদিম পরিবেশ করার চেষ্টা হয়েছে, বৃষ্টি না পড়লে, বিকেল বেলায় গুচ্ছের চ্যাঁ-ভ্যাঁর মধ্যে সেই আদিমতা কতটা পাওয়া যেত জানি না, কিন্তু এই যে কুলকুল করে বৃষ্টির জল, ক্রমে ঝড়ঝড় করে, স্রোতের মত খলবল করে, মাঠ ডুবিয়ে, পা মাড়িয়ে চলছে, গাছের গোড়ায় ঝিঁঝিঁ ডাকছে, চারদিকে প্রাণীটি নেই, বিশাল বিশাল গাছের গুঁড়িরা মেঘের সঙ্গে মিলে অন্ধকার ঘনিয়ে এনেছে - এ দেখে আমাদের মন ভাল হয়ে গেল।
ফিরে এসে ড্রাইভারজীকে বললাম আত্তুকালটা টপ করে ঘুরে আসা যায় না। তিনি সানন্দেই গেলেন। যাবার সময় এক জায়গায় থেমে ছিলাম আগেরবার। সেখান থেকে একটা চা বাগানের মধ্যে দিয়ে গিয়ে আত্তুকাল জলপ্রপাতের দারুন একটা দৃশ্য দেখেছিলাম। এবারও সেটা করার জন্য বলে শুনলাম, ওখানটা বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে একটু দূর থেকে একটা জায়গায় দুধের জায়গায় ঘোল পাওয়া যাবে। সেটাও মন্দ নয়।
জলপ্রপাতের ঠিক পাশে একটি বাড়ি আছে, তাঁরাই সামনেটাতে একটা চা কফির দোকান করেছেন, গতবারে টাইগার বলে একজন কুকুর শ্রেনীর জীবের সঙ্গে সেখানে আলাপ হয়েছিল। এবারে গিয়ে শুনলাম, টাইগার মারা গেছে। জলপ্রপাতের সামনে তো কিছু কথা বলা বা শোনা যায় না, তাই টাইগার আগেরবার কেমন বিস্কুট খাবার জন্য সবার সামনে দিয়েই গুঁড়ি মেরে লুকিয়ে লুকিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, সে সব নানা ভাবনায় ছেদ পড়তে পারল না। কিছুক্ষণ বসে বসে বর্ষাকালের আত্তুকালের মনমোহিনী দেখে কুয়াশায় কালচে নীল পথ পেরিয়ে হোটেলে চলে এলাম।
এই যে শোঁ-শোঁ করে সময় চলে যাচ্ছে, আমরা অসহায়ের মত শুধু দেখছি আর দেখছি, এ জিনিস এক জায়গায় বেশ কিছু বছর পর আবার আসলে বেশ বোঝা যায়। দেখার চোখে যত ঘনায় ছানির অমাবস্যা, তত বাড়ে দেখার ক্ষমতা, যত কাঁধ ঝুঁকে আসে, তত স্পষ্ট করে মাটিটা চিনতে পারা যায়, তারপর কোটি কোটি অসংখ্য প্রানের মত, টাইগারের মত, সব বোকামো, বুদ্ধি, হিংসা, ধর্ম এখানে ফেলে চলে যেতে হয়। নিঃশব্দে!