একক ভ্রমনের বিস্তর সুবিধা। যারা অভ্যস্ত তারাই এর মর্ম জানেন। তবে যেটা এর সবচেয়ে বড় সুবিধে, অর্থাৎ চোখ ও কানের সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার, সেটাই মাঝে মাঝে বিস্তর অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একাদিক্রমে ছ'বছর কাজ করার একটা স্বীকৃতি দেবার জন্য একদিন আমাকে কলকাতায় ডাকা হোলো এবং অর্পিতা কোনমতেই ছুটি না পাওয়ায় দিল্লি-ভুবনেশ্বর রাজধানীতে আমি একক ভ্রমন সুরু করলাম। গ্রীষ্মকাল। পঞ্চাশ কিলোমিটার অটো এবং মেট্রোয় পাড়ি দিয়ে ধীরাগমনে আমি নতুন দিল্লি রেলওয়ে স্টেশনে ঢুকলাম। ধীরে না ঢুকে কোনো উপায় ছিলো না, কারণ প্রচন্ড ভিড়, কাতারে কাতারে লোক মেলা দেখার মত করে স্টেশনে ঢুকতে চাইছে। একটা মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে ব্যাগ স্ক্যান হচ্ছে। ঠিক আছে, নিজেদেরই সুরক্ষার বিষয়, অধৈর্য হলাম না। জনসমুদ্র ঠেলে যখন সেই মেটাল ডিটেক্টরের কাছে পৌছালাম, দেখলাম সবাই ব্যাগ ওটার ভিতর ঠেলে ঠুসে দিচ্ছে, যেন না ঠেলে দিলে স্ক্যান হবে না। অনেক লোক হাত বাড়িয়ে ব্যাগ ঢুকিয়ে দিচ্ছে আগে ভাগেই, কেন কে জানে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় যেটা, মনিটরে সেই স্ক্যান দেখার লোকটি থুড়ি রেল পুলিশটি সেটার থেকে অন্যদিকে চেয়ারটা ঘুরিয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন। এদিকে ব্যাগের পর ব্যাগ স্ক্যান হয়ে যাচ্ছে। দেখে শুনে স্তম্ভিত হতে যাব, এমন সময় একজন ভদ্রলোক (?) আমাকে বেমক্কা ঠেলে মানুষের জন্য মেটাল ডিটেক্টরের দরজা দিয়ে হুশ করে বেরিয়ে গেলেন। ভাবলাম ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে বোধহয়। ওমা, ওপাশে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি আমার ব্যাগ নিয়ে পুলিশটাকে একটু পর্যবেক্ষণ করছি, এমন সময় একটা ছেলে এসে ওই ঠেলা মারা ভদ্রলোককে বলল, পাপা অভি বহোত টাইম হ্যায়, চলিয়ে পহেলে কুছ খা লেতে হ্যায়।
ভালো করে দেখলাম ওদের দুজনকে, স্বাভাবিক মুখচোখ, কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য নেই। অবশ্য যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য আমি খুঁজছি সেটা পাওয়া যাবে না। একবার লাইন দিয়ে টিকিট কাটতে গিয়ে এক পাঞ্জাবী ভদ্রলোকের (?) সঙ্গে তর্কাতর্কি হয়। তিনি বেলাইনে টিকিট কাটতে চেষ্টা করছিলেন। আমি তাঁর এ প্রচেষ্টায় প্রথমে অসহযোগিতা ও পরে নিরাশ হতে করুণাবশতঃ তিনি আমার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলন করতে বলেছিলেন, ইন্ডিয়াকা কুছ নেহি হোগা ভাইসাব, সব ইঁহাপে এয়সাহি হ্যায়। তত্ত্বকথা মনে পড়ে যেতে শান্ত হলাম ও ধীরাগমনে স্টেশনে প্রবেশ করলাম।
দেড়ঘন্টা আগে পৌঁছে গেছি, অতএব বসার একটা জায়গা চাই। নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে একটাও সিট খালি নেই। হঠাৎ একটা লোকাল ট্রেন ঢুকলো আর গোটা প্ল্যাটফর্ম জুড়ে সব সিট আমার হয়ে গেল। এবার কোন সিটটায় বসব ? এটা ঠিক পরিস্কার নয়, এটার হাতল নেই, এটা - না এটার সামনে আবার ডাস্টবিন। এই মনস্তত্বটা আমি আগেও দেখেছি, মাত্র একটা জায়গা থাকলে দৌড়ে এসে বসে পড়তাম - এইরে আবার অনেক লোক আসছে, চট করে বসে পড়ি।
'কান খোঁচাবেন?' এই সেরেছে। একজন সবুজ জামা পরা ছেলে আমার পাশে।
'না ভাই, আমার কান পরিস্কার আছে।'
'আরে আমাকে দিন, একদম পরিস্কার করে দেব দু'মিনিটে' - সে জোর করে।
'বললাম তো না, আমি ঠিক আছি।'
'পরিষ্কার করে নিলে পারতেন' - বলে সে উন্নাসিক চলে যায়।
নিস্কৃতি পেয়ে আমি বসে থাকি। সামনে একটা কানপুর যাবার শতাব্দী এক্সপ্রেস এসে দাঁড়ায়। ঝকঝকে ট্রেন। বসে বসে ট্রেনটার খুঁটিনাটি দেখতে থাকি। হঠাৎ পাশ থেকে বাজখাঁই গলায় হুঙ্কার আসে, সামোসা লা রে। চমকে দেখি পাশে কখন একজন টিকিট চেকার বসেছেন এবং তিনিই আওয়াজটা করেছেন। সেই চকচকে শতাব্দী ট্রেন থেকে ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরা একজন অল্পবয়সী খাবার সার্ভ করার ছেলে বেরিয়ে আসে এবং সিল করা প্যাসেঞ্জারদের জন্য সিঙারার প্যাকেট থেকে সিঙারা বের করে দেয়। আবার আমার তত্ত্বকথা মনে পড়ে।
ক্রমে প্ল্যাটফর্ম আবার ভরে ওঠে। বিভিন্ন ধরনের লোকজন দেখতে থাকি। একজন মেয়ে সামনের শতাব্দী এক্সপ্রেসটায় ওঠার জন্য সঙ্গের ছেলেটিকে বলেন তার ছোট্ট ব্যাগটি ধরতে। টিকিট চেকারটি অতঃপর চায়ের অর্ডার করেন এবং মাথার পিছন থেকে আওয়াজ আসে, 'কান খোঁচাবেন?' দেখি সেই সবুজ জামা, ভীষণ বিরক্ত হই, গম্ভীর ভাবে বলি, না। সে আবার যুক্তি দেখানোর জন্য মুখ খুলতেই আবার বলি, না। ততোধিক বিরক্ত হয়ে সে চলে যায়।
এবার আমার ট্রেন আসবার সময় হয়ে যাচ্ছে। উঠে একটু হাত পা খেলিয়ে নিই। একটু পায়চারি করি, দোকান থেকে ম্যাগাজিন, কোল্ড ড্রিঙ্কস কিনি। বগি নাম্বার দিয়ে দিয়েছে, নির্দিষ্ট বগির কাছে দাঁড়াই। ট্রেন আসছে কিনা দেখার চেষ্টা করি। আতঙ্কিত হয়ে দেখি, ট্রেন না সেই সবুজ জামা আসছে। সবাইকে উপকারিতা বোঝাতে বোঝাতে। এই এসে পড়ল। সোজা ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। যেই আমাকে প্রস্তাবতা দিতে যাবে, ছদ্মগম্ভীর ভাবে বলি, এই নিয়ে তিনবার হলো। অপ্রস্তুত ভাবে একটু হেসে সে চলে যায়। সশব্দে ট্রেন এসে পড়ে। অবধারিত ভাবে বগিটা নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়ায় না। অনেকটা এগিয়ে চলে যায়। সবাই আমরা লটবহর নিয়ে দৌড়তে থাকি। অনেক ধাক্কাধাক্কি করে অবশেষে নির্দিষ্ট বগির নির্দিষ্ট আসনটিতে পৌঁছাই। আমার ছোট একটি ব্যাগ সিটের তলায় ঢুকিয়ে জানালার ধারে বসি।
আমার লোয়ার বার্থ, সুতরাং দান করবার জন্য প্রস্তুত হই। লোয়ার বার্থের নিয়মই হচ্ছে অন্য লোককে দিতে হবে। এতবড়ো দেশ আমাদের। বয়স্ক, অসুস্থ, সন্তানসম্ভবা, সদ্য জননী ও বাচ্চা প্রচুর। সেটা সমস্যা হয় না। সমস্যা হয় লোভে। যদি ওনার কাছ থেকে এই গল্পটা ফেঁদে নিচের সিটটা বাগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে বেশ সিন সিনারি দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। বলেই দেখি না। বোকাসোকা হলে দিয়ে দেবে। অথবা বড় ব্যাগটা ঠিক করে ঢোকাব না, পায়ে লাগবে, ঠিক করে বসতে পারবে না, তখন বলব, এ হেঃ, আপনার তো খুব অসুবিধে হচ্ছে বসতে, আপনি আরাম করে উপরে চলে যান না, আমি কষ্ট করে ঠিক চলে যাব। এসব ফন্দি আমি হাড়েহাড়ে জানি। তাই মুক্ত মন নিয়ে বসে থাকি। দেখি কে আসে।
একজন এসে পড়েন, মানে আক্ষরিক অর্থেই, আসেন ও প্রবল বেগে সিটের ওপর পড়েন। শঙ্কিত হই, লেগেছে মনে হয়। না, ভদ্রলোক একগাল হাসেন। 'তাড়াহুড়োতে পা টা স্লিপ করে গেল, লাগেনি।' জিনিসপত্র গুছিয়ে নেন। তারপর শান্ত হয়ে বসে বলেন, 'জানেন, প্রতিবার এই হয়। জানি সিট কোথাও পালাবে না, তাও তাড়াহুড়ো করি। ট্রেনে বসতে পারলে তবে শান্তি।' আমি সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ি। বাকিদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। দুজন ভদ্রলোক, একজন ত্রিশের আশেপাশে, আর একজন মধ্য বিশের, সঙ্গে একজন বছর কুড়ির মেয়ে, ক্যুপে আসেন। মেয়েটির কোলে সদ্যজাত শিশু। আমি উপরের সিটটা একবার দেখে নিই। এঁদের সঙ্গে প্রচুর ব্যাগ। সেইসব ব্যাগ কোথায় কোনটা থাকবে সেই নিয়ে তাঁদের নিজেদের মধ্যেই মতভেদ তৈরী হয়। ফলে আমাদের ক্যুপটার সামনে জনজট হয়। একজন পাঞ্জাবি ভদ্রলোক, তাঁর মা ও ছেলে এরই মধ্যে ঠেলেঠুলে ঢুকে পড়েন। ঢুকেই ওই লোক দুজনকে বলেন, 'ব্যাগ ফ্যাগ গোছানো পরে হবে আগে সিট বুঝে নেওয়া যাক।' রিজার্ভ করা সিট কি ভাবে আবার নতুন করে বুঝে নেওয়া সম্ভব বুঝতে পারি না। দেখি আর কেউও সেটা বুঝতে পারেনি। তবে একটা সম্ভাবনার কথা মাথায় উঁকি দিয়ে যায়। বলি, আপনাদের বুঝি উপরের সিট? ভদ্রলোক প্রবলবেগে মাথা নেড়ে আমাকে বোঝাতে যাবার আগেই, ওই মাথা নাড়া দেখেই বলি, আমার নিচের সিট, এখন আমি বসব, রাত্রে উপরে উঠে যেতে পারি। নিন এবার ওদের ব্যাগ গুছিয়ে নিতে দিন। ওখান দিয়ে কেউ যাতায়াত করতে পারছে না।
ওঁরা বসেন। তারপর বোঝা যায় যে, বয়স্কা ভদ্রমহিলা একাই যাবেন, এরা ওঁকে তুলে দিতে এসেছেন। অন্য সহযাত্রী ত্রয়ের ব্যাগ গোছানো শেষ হয় অবশেষে। তারাও ধাতস্হ হয়ে বসেন । ট্রেনের ভিতরে অন্যাউন্স হয় বৈধ যাত্রী ছাড়া আর সবাইকে নেমে যেতে বলে। ট্রেন ছাড়ার জন্য প্রস্তুত। পাঞ্জাবি ভদ্রলোকটি নামবার সময় আমাকে বলেন ওঁর মাকে একটু দেখতে, আর টাটানগরে নামতে সাহায্য করতে। খেয়াল করে দেখলাম, সেই সিট সংক্রান্ত কথাবার্তার পর ভদ্রলোক এই আবার কথা বললেন। দারুন হিসেবী মানুষ।
ট্রেন দুলে উঠলো, এবং আমরা সবাই চট করে দু'সেকেন্ডের জন্য যাবতীয় কথা, ঝগড়া, চেঁচামিচি বন্ধ করে ইষ্টনাম স্মরণ করলাম। ভাবখানা এরকম যে দেখো, প্রনাম করলুম, কিছু হলে বাঁচিও!
দেড়ঘন্টা আগে পৌঁছে গেছি, অতএব বসার একটা জায়গা চাই। নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে একটাও সিট খালি নেই। হঠাৎ একটা লোকাল ট্রেন ঢুকলো আর গোটা প্ল্যাটফর্ম জুড়ে সব সিট আমার হয়ে গেল। এবার কোন সিটটায় বসব ? এটা ঠিক পরিস্কার নয়, এটার হাতল নেই, এটা - না এটার সামনে আবার ডাস্টবিন। এই মনস্তত্বটা আমি আগেও দেখেছি, মাত্র একটা জায়গা থাকলে দৌড়ে এসে বসে পড়তাম - এইরে আবার অনেক লোক আসছে, চট করে বসে পড়ি।
'কান খোঁচাবেন?' এই সেরেছে। একজন সবুজ জামা পরা ছেলে আমার পাশে।
'না ভাই, আমার কান পরিস্কার আছে।'
'আরে আমাকে দিন, একদম পরিস্কার করে দেব দু'মিনিটে' - সে জোর করে।
'বললাম তো না, আমি ঠিক আছি।'
'পরিষ্কার করে নিলে পারতেন' - বলে সে উন্নাসিক চলে যায়।
নিস্কৃতি পেয়ে আমি বসে থাকি। সামনে একটা কানপুর যাবার শতাব্দী এক্সপ্রেস এসে দাঁড়ায়। ঝকঝকে ট্রেন। বসে বসে ট্রেনটার খুঁটিনাটি দেখতে থাকি। হঠাৎ পাশ থেকে বাজখাঁই গলায় হুঙ্কার আসে, সামোসা লা রে। চমকে দেখি পাশে কখন একজন টিকিট চেকার বসেছেন এবং তিনিই আওয়াজটা করেছেন। সেই চকচকে শতাব্দী ট্রেন থেকে ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরা একজন অল্পবয়সী খাবার সার্ভ করার ছেলে বেরিয়ে আসে এবং সিল করা প্যাসেঞ্জারদের জন্য সিঙারার প্যাকেট থেকে সিঙারা বের করে দেয়। আবার আমার তত্ত্বকথা মনে পড়ে।
ক্রমে প্ল্যাটফর্ম আবার ভরে ওঠে। বিভিন্ন ধরনের লোকজন দেখতে থাকি। একজন মেয়ে সামনের শতাব্দী এক্সপ্রেসটায় ওঠার জন্য সঙ্গের ছেলেটিকে বলেন তার ছোট্ট ব্যাগটি ধরতে। টিকিট চেকারটি অতঃপর চায়ের অর্ডার করেন এবং মাথার পিছন থেকে আওয়াজ আসে, 'কান খোঁচাবেন?' দেখি সেই সবুজ জামা, ভীষণ বিরক্ত হই, গম্ভীর ভাবে বলি, না। সে আবার যুক্তি দেখানোর জন্য মুখ খুলতেই আবার বলি, না। ততোধিক বিরক্ত হয়ে সে চলে যায়।
এবার আমার ট্রেন আসবার সময় হয়ে যাচ্ছে। উঠে একটু হাত পা খেলিয়ে নিই। একটু পায়চারি করি, দোকান থেকে ম্যাগাজিন, কোল্ড ড্রিঙ্কস কিনি। বগি নাম্বার দিয়ে দিয়েছে, নির্দিষ্ট বগির কাছে দাঁড়াই। ট্রেন আসছে কিনা দেখার চেষ্টা করি। আতঙ্কিত হয়ে দেখি, ট্রেন না সেই সবুজ জামা আসছে। সবাইকে উপকারিতা বোঝাতে বোঝাতে। এই এসে পড়ল। সোজা ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। যেই আমাকে প্রস্তাবতা দিতে যাবে, ছদ্মগম্ভীর ভাবে বলি, এই নিয়ে তিনবার হলো। অপ্রস্তুত ভাবে একটু হেসে সে চলে যায়। সশব্দে ট্রেন এসে পড়ে। অবধারিত ভাবে বগিটা নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়ায় না। অনেকটা এগিয়ে চলে যায়। সবাই আমরা লটবহর নিয়ে দৌড়তে থাকি। অনেক ধাক্কাধাক্কি করে অবশেষে নির্দিষ্ট বগির নির্দিষ্ট আসনটিতে পৌঁছাই। আমার ছোট একটি ব্যাগ সিটের তলায় ঢুকিয়ে জানালার ধারে বসি।
আমার লোয়ার বার্থ, সুতরাং দান করবার জন্য প্রস্তুত হই। লোয়ার বার্থের নিয়মই হচ্ছে অন্য লোককে দিতে হবে। এতবড়ো দেশ আমাদের। বয়স্ক, অসুস্থ, সন্তানসম্ভবা, সদ্য জননী ও বাচ্চা প্রচুর। সেটা সমস্যা হয় না। সমস্যা হয় লোভে। যদি ওনার কাছ থেকে এই গল্পটা ফেঁদে নিচের সিটটা বাগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে বেশ সিন সিনারি দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। বলেই দেখি না। বোকাসোকা হলে দিয়ে দেবে। অথবা বড় ব্যাগটা ঠিক করে ঢোকাব না, পায়ে লাগবে, ঠিক করে বসতে পারবে না, তখন বলব, এ হেঃ, আপনার তো খুব অসুবিধে হচ্ছে বসতে, আপনি আরাম করে উপরে চলে যান না, আমি কষ্ট করে ঠিক চলে যাব। এসব ফন্দি আমি হাড়েহাড়ে জানি। তাই মুক্ত মন নিয়ে বসে থাকি। দেখি কে আসে।
একজন এসে পড়েন, মানে আক্ষরিক অর্থেই, আসেন ও প্রবল বেগে সিটের ওপর পড়েন। শঙ্কিত হই, লেগেছে মনে হয়। না, ভদ্রলোক একগাল হাসেন। 'তাড়াহুড়োতে পা টা স্লিপ করে গেল, লাগেনি।' জিনিসপত্র গুছিয়ে নেন। তারপর শান্ত হয়ে বসে বলেন, 'জানেন, প্রতিবার এই হয়। জানি সিট কোথাও পালাবে না, তাও তাড়াহুড়ো করি। ট্রেনে বসতে পারলে তবে শান্তি।' আমি সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ি। বাকিদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। দুজন ভদ্রলোক, একজন ত্রিশের আশেপাশে, আর একজন মধ্য বিশের, সঙ্গে একজন বছর কুড়ির মেয়ে, ক্যুপে আসেন। মেয়েটির কোলে সদ্যজাত শিশু। আমি উপরের সিটটা একবার দেখে নিই। এঁদের সঙ্গে প্রচুর ব্যাগ। সেইসব ব্যাগ কোথায় কোনটা থাকবে সেই নিয়ে তাঁদের নিজেদের মধ্যেই মতভেদ তৈরী হয়। ফলে আমাদের ক্যুপটার সামনে জনজট হয়। একজন পাঞ্জাবি ভদ্রলোক, তাঁর মা ও ছেলে এরই মধ্যে ঠেলেঠুলে ঢুকে পড়েন। ঢুকেই ওই লোক দুজনকে বলেন, 'ব্যাগ ফ্যাগ গোছানো পরে হবে আগে সিট বুঝে নেওয়া যাক।' রিজার্ভ করা সিট কি ভাবে আবার নতুন করে বুঝে নেওয়া সম্ভব বুঝতে পারি না। দেখি আর কেউও সেটা বুঝতে পারেনি। তবে একটা সম্ভাবনার কথা মাথায় উঁকি দিয়ে যায়। বলি, আপনাদের বুঝি উপরের সিট? ভদ্রলোক প্রবলবেগে মাথা নেড়ে আমাকে বোঝাতে যাবার আগেই, ওই মাথা নাড়া দেখেই বলি, আমার নিচের সিট, এখন আমি বসব, রাত্রে উপরে উঠে যেতে পারি। নিন এবার ওদের ব্যাগ গুছিয়ে নিতে দিন। ওখান দিয়ে কেউ যাতায়াত করতে পারছে না।
ওঁরা বসেন। তারপর বোঝা যায় যে, বয়স্কা ভদ্রমহিলা একাই যাবেন, এরা ওঁকে তুলে দিতে এসেছেন। অন্য সহযাত্রী ত্রয়ের ব্যাগ গোছানো শেষ হয় অবশেষে। তারাও ধাতস্হ হয়ে বসেন । ট্রেনের ভিতরে অন্যাউন্স হয় বৈধ যাত্রী ছাড়া আর সবাইকে নেমে যেতে বলে। ট্রেন ছাড়ার জন্য প্রস্তুত। পাঞ্জাবি ভদ্রলোকটি নামবার সময় আমাকে বলেন ওঁর মাকে একটু দেখতে, আর টাটানগরে নামতে সাহায্য করতে। খেয়াল করে দেখলাম, সেই সিট সংক্রান্ত কথাবার্তার পর ভদ্রলোক এই আবার কথা বললেন। দারুন হিসেবী মানুষ।
ট্রেন দুলে উঠলো, এবং আমরা সবাই চট করে দু'সেকেন্ডের জন্য যাবতীয় কথা, ঝগড়া, চেঁচামিচি বন্ধ করে ইষ্টনাম স্মরণ করলাম। ভাবখানা এরকম যে দেখো, প্রনাম করলুম, কিছু হলে বাঁচিও!