কেরিয়ার অথবা গ্রাসাচ্ছাদন

No comments:
 
আর পাঁচটা সাধারণ বিকেলের মত এক বিকেলে একজন ভদ্রলোক তাঁর ছেলেকে নিয়ে আমাদের বাড়ি এলেন। আমি চিনি না, উনি আমাকে চেনেন। ছেলেটির কালই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে, এবার সে কি নিয়ে পড়বে! আমার স্কুলের জুনিয়র। কোনো স্যার আমার নাম বলেছেন ভদ্রলোককে। 'ওর কি ইচ্ছে ?' জানতে চাইলাম। 'ওর তো ইচ্ছে আইদার মাইক্রোবায়োলজি অর বায়োটেকনোলজি নিয়ে পড়ে।' ছেলের হয়ে বাবা উত্তর দিলেন। ২০০৩ সাল। মাইক্রোবায়োলজি, বায়োটেকনোলজি - এসব মার্কেটে নতুন এন্ট্রি। দারুন কাটতি। একটাই খচখচ, এসএসসি নেই। আমি নিজে মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে পড়ছি তখন। সত্যি কথাটা বললাম, 'ওর কি ভবিষ্যতে কোম্পানিতে কাজ করার ইচ্ছে ? না হলে এই লাইনে ...' । ভদ্রলোক বললেন, 'কেন কোম্পানিতে তো প্রচুর ইয়ে। তুমি কি করবে বলে ভাবছ এরপর ?' আমি বললাম 'জানি না।  এমএসসি টা তো আগে শেষ করি।' উনি বললেন, 'হুম। তাহলে তোমার মতে এসব পড়ে এক্সট্রা কোনো ফিউচার নেই। আমি কিন্তু খোঁজ নিয়েছি। এসব পড়ে কেউ বসে থাকে না।' ঝেড়ে কাশলাম, 'দেখুন, যদি কেউ এমএসসি করে পিএইচডি করতে চায়, তাহলে নেট দিতে হবে।  নেটের যা সিলেবাস তাতে জুওলজি থেকে পাবার সম্ভাবনা সব থেকে বেশী। জুওলজি, বোটানি, ফিজিওলজি এসব সাবজেক্টই ভালো।অনেক ব্রড। মাইক্রোবায়োলজিই বলুন বা বায়োটেকনোলজি, এসব খুব ন্যারো সাবজেক্ট।' উনি প্যাঁচার মত মুখ করে চলে গেলেন।

পরে দেখলাম এ কি রে বাবা।  সব শেয়ালেরই যে দেখি এক রা। এমএসসির পর পিএইচডি করছি। পাড়ায় দূর্গাপুজায় অষ্টমীর অঞ্জলি দিতে গেছি। স্কুলের এক স্যারের সঙ্গে দেখা। খুব পক্ষপাতদুষ্ট বর্নান্ধ লোক। ব্রাহ্মণ ছাত্রদের মাথায় তুলে রাখতেন। প্রনাম করতে বললেন, 'কি রে। চাকরি বাকরি কিছু একটা তো এবার কর। বাবার আর কত বাকি রিটায়ারের।' আরে এ'কথাটা ব্যাঙ্কের কর্মচারী আমার বাবা বললে তাও বোঝা যায়, একজন শিক্ষক কি করে বলে !

তখন দুইয়ে দুইয়ে চব্বিশ করলাম। শিক্ষা = কেরিয়ার = টাকার মেশিন। আবার অশিক্ষা = মাস্তানি/ রাজনীতি/চুরি-চামারি = টাকার মেশিন। অর্থাৎ, শিক্ষা = অশিক্ষা। একটার কলার সাদা, আর একটা একটু ময়লা। এক সুধী বললেন, 'টাকা ছাড়া খাবে টা কি বাবা'। বললাম, 'তা ঠিক। খাব কি। খেয়ে পরে বাঁচতে গেলে মাসে কত টাকা লাগতে পারে জেঠু ?' জেঠু হেসে বললেন, 'তোমার কোনো ধারণা নেই, আজকাল খেয়ে পরে বাঁচতে কত টাকা লাগে।' বললাম, 'না আপনি বলুন না, তাও কত। মাসে লাখ দুয়েক হলে চলে যাবে?' এবার জেঠু বিষম খেলেন, 'না না।  অত লাগে না। আর অত তোমাকে দিচ্ছে কে ?' বললাম, 'ও। অত লাগে না তাহলে। কারণ আপনি মধ্যবিত্ত। যারা উচ্চবিত্ত তাদের লাগে। এর চেয়ে ঢের বেশি লাগে। আর যারা মুটে-মজুর তাদের মাসের রোজগার আপনার নাইকির জুতোর অর্ধেক।' জেঠু এই অকালপক্ককে অনতিবিলম্বে বিদায় দিলেন।

শুনেছি রামকিঙ্কর বেজকে আজীবন দারিদ্র ভোগ করতে হয়েছিল। মানিক বন্দোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী,ভ্যান গগ, কত নাম করব। এদের সমসাময়িক কত লোক কত কোটি টাকা রোজগার করেছে, তাদের কেউ চেনে না কেন কে জানে। কলিকাল !

শুনেছি ভালো কাজের কেউ মর্ম দেয় না। আবার যে এই কথাটা বলে দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ছে সেও দেয় না। তাহলে সমালোচনা মানে তো সময় নষ্ট। আমার এক বন্ধু ছবি আঁকা নিয়ে থাকতে চায়, তার চারপাশের লোকের সে কি চিন্তা। মাঝে নানাভাবে চাপ খেয়ে কখনো কোনো চাকরির দরখাস্ত করে, আর তার মা গিয়ে পুজো দিয়ে আসে। সবাই হতাশ। আমি সমস্যাটা বুঝতে পারি না। ও তো দিব্যি টিউশন করছে, মানে আঁকা শেখাচ্ছে, নিজে আঁকছে, কম্পিউটারে ব্যানার বানাচ্ছে, ছবি এডিট করছে। তাহলে প্রবলেমটা কোথায়। ও জয়েন্ট এন্ট্রান্স দেয়নি বলে, পলিটেকনিক পড়েনি বলে, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হলো না বলে - নাকি এসব ছকে বাঁধা পথ দিয়ে টাকা ছাপানোর মেশিনটা কিনতে পারল না বলে। আমাদের সঙ্গেই একটি অতীব বিচ্ছু ছেলে পড়ত, সব শিক্ষক বলতেন ওর কিচ্ছু হবে না, আজ সময়মত পার্টি বদলে বদলে প্রমোটার। তাকে নিয়ে কারও কোনো অভিযোগ নেই। কারণ সে বহুদিন ধরে মানুষের খুঁজে বের টাকা রোজগারের বিভিন্ন পথের একটি পথে চলেছে।  সুতরাং 'নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে'। অন্য ছেলেটা এই সব ছবি-ফবি এঁকে কি যে খাবে!

এই খাবার খোঁজই কি আমার কেরিয়ার ! আমি যে ইতিহাস পড়ছি, জানতে পারছি, ভূগোল পড়ছি, বুঝতে পারছি, দর্শন পড়ছি, উপলব্ধি করতে পারছি, বিজ্ঞান পড়ছি, প্রশ্ন করছি, আকাশে মেঘ দেখে ভালো লাগছে, ছবি আঁকছি, গান গাইছি, মূর্তি গড়ছি, কবিতা লিখছি - এ সব শুধু আমার খাবার জন্য ! ইতিহাসের থেকে ভূগোলে স্কুলে টিচার হবার সুযোগ বেশি, মেডিক্যাল সাইন্স পড়লে প্রচুর পসার, আইটি তে প্রচুর টাকা, বায়োটেকনলজি পড়লে নাকি 'কেউ বসে থাকে না' !

সম্প্রতি একটা ভালো খবর পেলাম। একটি ছেলে, আমার অনেক জুনিয়র, প্রত্যন্ত গ্রামে বাড়ি, বাবা পুরোহিত, দূর্গাপুজোয় নানা জায়গায় ছেলেটি বাবার সঙ্গে পুজো করতে যায়, মানে তাকে যেতে হয় - এমএসসি তে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছে। আমার সঙ্গে আগে থেকেই আলাপ। পরীক্ষার তখন রেজাল্ট বেরোয়নি, আমি বলেছিলাম, 'তুমি কি সিওর যে পিএইচডি-ই করবে। টাকা পয়সার কিন্তু খুব সুবিধে নেই। তোমার বাড়িতে একটা রেসপনসিবিলিটি আছে। সব দিক ভেবে দেখেছ তো।' সে বলল, 'দাদা, আমাদের পুজো করে যা আসে আর আমি একটা স্কলারশিপ পেয়ে গেলে যা পাবো, তাতে আমাদের চলে যাবে, খুব তো বেশি কেউ নেই সংসারে। বাবা মা আমার কাছ থেকে অনেক টাকা - এসব কিছু চায় না। আমাদের কোনো অসুবিধে হবে না।' আমি জানি ছেলেটির ফ্যামিলি বিত্তবান তো নয়ই, মধ্যবিত্তও বলা যায় না। অথচ সেদিন কি অসম্ভব সমৃদ্ধশালী লাগছিল তাকে। গ্রাসাচ্ছাদন আমার পেটের জন্য আর কেরিয়ার আমার মনের জন্য এটা বুঝতে তাকে আলাদা করে কোনো সময় বের করতে হয়নি। 

No comments:

 
অবসরে । ২০১৪ ।