আমি সবে দেখলাম বাগান ও ফুল।
দীর্ঘদিন এ উদ্যানে থেকে,
নানা প্রশ্রয়, নানা অভয়বাণী শুনে,
অল্প করে চোখ খুলে দেখলাম - বাগান এবং সতেজ ফুল।
আমি দেখলাম আমাকে পরিপাটি করে ঘিরে রাখা আছে,
ছুঁচোরা আমার গায়ের গন্ধ পাচ্ছে না ।
আমার চারধারে সাজানো দারুণ নরম গল্প।
আমি প্রাণভরে কয়েক দমক শ্বাস নিয়ে নিলাম।

কিন্তু বাতাস আমার শরীরে ঢুকল না,
আমার ফুসফুসের তলা কাটা -
আমি ঠিক এটাই ভুলে যেতে চাইছিলাম।
নানা নিরাপত্তা, সুন্দর দৃশ্য, প্রেম, মানবিকতা,
নানা বই, ধর্ম, ভাষা, খাদ্য,
নানা কেরিয়ার, বিয়ে, শিশু,
নানারকম মনভুলানো বিষয় নিয়ে মেতে থেকে -
আমি এই সর্বনাশা কাটা ফুসফুসটার কথা ভুলে থাকতে চাইছিলাম।

আমি তো চেয়েছিলাম তুচ্ছ বিষয় নিয়ে দাঙ্গা হোক,
আমি চেয়েছিলাম আমার পাড়ায় বাইরের লোক ঢুকবে না,
আমি চেয়েছিলাম আত্মা, পরমাত্মা নিয়ে সোসাইটি হোক,
আমি চেয়েছিলাম আমরা সবাই হাতে হাত ধরে গান গাই।
আমি তো প্রাণপণে চোখ বন্ধ করে রাখতেই চেয়েছিলাম।

আমি আজও সমস্যাটা নিয়ে লিখছি ফেশবুকে, ব্লগে।
জানি, এতে আমাকে আমার সুন্দর বাগান থেকে কেউ সরাতে চাইবে না ।
আমি অক্ষত থেকে যাব। আমার প্রতিবাদ হোক, বা যন্ত্রণা -
নিরাপদ থেকে যাবে।
কিন্তু, এও সঙ্গোপনে জানি, আমার মাথায় ঘুন ধরে গেছে,
এ নরক থেকে আমার নিস্তার নেই!

(ভয়ানক ভয়ানক, লাগাতার বাজে, বিশ্রী খবর পড়ে এইসব নিরাপদ লেখার বিলাসিতা করলাম। সেই মানুষটির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, যিনি বলেছিলেন, কি করব, আমি তো ভালো ভালো কথাই ভাবতে চাই, বলতে চাই, লিখতে চাই, কিন্তু যা নিয়েই কথা বলতে বসি তাতেই দেখি জোচ্চুরি আর নোংরামি।)

সম্প্রতি Vimeo মজা করে একটা ট্রেলার বানাতে বলেছিল, এমন ভাবে যেন একটা সিনেমা বা টিভি সিরিজ আসতে চলেছে। বিষয়বস্তু ছিল মনের ইচ্ছে। তো দুজন লোককে পাকড়াও করে এই ৪৩-৪৪ ডিগ্রী গরমের হরিয়াণাতে সেই মজায় অংশ নিয়ে ফেললাম। নষ্ট করার সময় না থাকলে তো আমার এই লেখা কেউ পড়বে না, তাই আরো সময় নষ্ট করার সুযোগ করে দিতে নিচে ট্রেলারটা পোস্ট করে দিলাম।



সদাশিব আর অর্পিতা হলো দুই গিনিপিগ। বেচারাদের সকাল সাড়ে পাঁচটায় কল টাইম দিয়েছিলাম! কিচ্ছু ব্রেকফাস্ট যোগাড় করে দিইনি। তারপর রোদে চেয়ার পেতে বসিয়ে, জঙ্গলে হাঁটিয়ে, নানা ড্রেস পাল্টে, চল্লিশ বার একই কথা বলিয়ে বলিয়ে দুপুরে, যা একটু জিরিয়ে নে - বলে, সন্ধ্যেতে আবার ডাবিং। ওরা রকমসকম দেখে হাসছিল, আপনারা পড়তে পড়তে হাসছেন (অবশ্য কেউ আদৌ পড়ছে কি না কে জানে, যাক গে), আর আমি মনে মনে হাসছি। সামনা সামনি ভীষনই গম্ভীর আর দারুণ বুদ্ধিজীবী মত মুখ করে ঘুরছিলাম অবশ্য। না হলে ব্যাপারটা শেষ করা যেত না। 

আমি ব্যালকনিতে বসে পা দোলাচ্ছিলাম, অর্পিতা এসে বলল, অনীকদারা কেরালা ঘুরতে যাচ্ছে। হানিমুনে। দারুণ জায়গা, কি বল? কোথায় কোথায় যাচ্ছে ? মুন্নার আর কোদাইকানাল। যাবি? 
কিছুটা সময় আমার প্রাপ্য ছিল। অনীকদা অবশেষে বিয়ে করল, নিশ্চিন্তে হানিমুনে যাবে, এর সঙ্গে 'যাবি' কথাটার কি যোগ? চোখ পাকিয়ে ফেলেছি দেখে তাড়াতাড়ি বলল, অনীকদা যেতে বলেছে। বলেই নিশ্চিন্তে বসে পড়ল। আমি অনীকদাকে ফোন লাগালাম, এ কি শুনছি? সে সর্বদাই ঋষিসুলভ ঠান্ডা মানুষ। আস্তে করে বলল, হ্যাঁ, আমিই অর্পিতাকে বললাম, তোরাও গেলে ভাল হয়। অবশ্য তোদের মুন্নার আগে দেখা। কি করবি? যেতে, ছুটি-ফুটি পেতে বোধহয় অসুবিধা হবে, না ? 
এ কি রকম ব্যাভার, কোথায় আমি অসুবিধার প্রসঙ্গ-টসঙ্গ তুলব তা নয়, এতো উল্টোচাপ! ভীষণ রেগে গিয়ে, এরপর আমি তোমাদের হানিমুনে আমরা হংসমধ্যে বকযথা কেন, আর একবার ভেবে দেখ, এসব কিছুই বলতে পারলাম না। ফোন সেরে এসে ল্যাপটপ খুললাম, টিকিট ও হোটেল বুকিংটা চটপট করে ফেলতে হবে। অর্পিতা অবশ্য প্রায়শই বলে যে, ল্যাপটপ খোলার সময় আমার মুখটা নাকি বেশ হাসি হাসিই লাগছিল। আমি যদিও কোনদিনই সেটা বিশ্বাস করিনি। 
আমরা থাকি দিল্লী থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, জয়পুরের রাস্তায়। সকাল সাড়ে পাঁচটার ফ্লাইট, তিনটের সময় বেরোতে হবে। যারা বেলা নটায় ওঠে তারা বুঝবে এটা কি ভয়ংকর বিষয়। না, তিনটের সময় ওঠা নয়, দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়া। ভীষণ ভাবে সব ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠবে, ফ্যানটা বড্ড গোঁ-গোঁ করছে, পাশের বাড়ীতে শব্দ করে বাসন ধুচ্ছে, ওফ, হাচিকো চেঁচাতে শুরু করল, হাচিকো থামল, একটা বাচ্চা কেঁদে উঠল। এইসব শুনতে ক্রমশ মাথা গরম হয়ে উঠবে, আর মনে পড়ে যাবে, কাল মিনত্রা থেকে ক্যাশ অন ডেলিভারী আসবে, কাউকে টাকা দিয়ে যাবার কথা মনে রইল না, স্যার বলেছিল, তোমার কাজ হয়ে গেলে পেন ড্রাইভটা আমার টেবিলে রেখে দিও, সেটা প্যান্টের পকেটে পড়ে আছে - ইত্যাদি হাজারো ঝঞ্ঝাট। শেষে দুটো নাগাদ চোখটা লেগে আসবে, আর আড়াইটেয় ট্যাং ট্যাং করে অ্যালার্ম বেজে উঠবে।
প্লেনে উঠে একঘণ্টা সময় জোর ঘুমিয়ে নিলাম। এদের তো দরজা-টরজা বন্ধ করে, আকাশে উঠে, সুস্থির হয়ে, খাবার ট্রলি করে মাঝের রো পর্যন্ত আনতে আনতে প্রায় একঘণ্টা লেগে যায়। আবার বিনে পয়সার খাবার নয়, তাই ঘুমিয়ে পড়লেও নিশ্চয় একটু জোরে ডেকে ঘুমটা ঠিক ভাঙিয়ে দেবে। দিলও তাই। গপগপ করে আমি উপমা আর অর্পিতা ওটস খেয়ে আবার হেলে গেলাম। কোচি আসবার আগে অবশ্য কি করে দুজনেরই ঘুমটা ভেঙ্গে গেছিল। একটা নদী পেরলাম, দু পার জুড়ে নারকোল গাছের সারি, জল থই থই সবুজ মাঠ, আর দুম করে সেই মাঠে প্লেনটা নেমে পড়ল। এরকম একটা সুন্দর খোলা এয়ারপোর্ট খুব একটা দেখা যায় না। এয়ারপোর্টের বাড়িটাও একতলা একটা ছিমছাম কটেজের মত। প্লেন থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে ঢুকে গেলাম। 
বাইরে সাদা ধুতি, পরিস্কার করে কামানো গাল, পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল, কপালে তিলক - আমাদের ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে চলল কথামঙ্গলমের দিকে। আবারও ঘুমিয়ে পড়তে কসুর করলাম না। একদম কথামঙ্গলম বাসষ্টেশনের সামনে নামিয়ে বলল, আর কিছু উপকার করতে পারি কি? আমরা কিছু বলতে না পেরে, অভিভূত হয়ে বাসষ্টেশনে ঢুকে গেলাম। ফাঁকা বাস ধীরে ধীরে ভরে গেল, পাহাড় এসে গেল, তাল তাল মেঘ ঘন হয়ে এল, শোঁ-শোঁ করে বৃষ্টি পড়তে লাগল। আমি যে আমি, পাহাড়ে গেলেই ওয়াক ওয়াক করি, সে পর্যন্ত জানলার খড়খড়ি অল্প ফাঁক করে, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। বর্ষায় পশ্চিমঘাট যে কি, সে বর্ণনা আমি করতে পারব না। বর্ষায় চেরাপুঞ্জি আমি গেছি। সর্ব শক্তি দিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় সেখানে অমোঘ।
বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস দুয়ার চেপে ধরে
কিন্তু, পশ্চিমঘাটে যেন অসংখ্য ছেঁড়া পর্দা, কখনো ভারী, কখনো পাতলা- ছিট কাপড়ের। চেরাপুঞ্জির মত নরম পলকা আঁচল দিয়ে সব সময় ঢেকে নেই। চোখ ঢেকে যাচ্ছে বৃষ্টিতে, অথচ ওরই ফাঁকে দেখতে পাচ্ছি, সামনের ঢালু সবুজ পাহাড়টায় তীব্র একফালি রোদ এসে পড়েছে। এপাশটায় কালচে নীল, ওপাশে কলার হলুদ আর কলাপাতার সবুজ মিলে মাতামাতি করছে। আমরা সাদা পেঁজা তুলোর মত মেঘের ছবি দেখছি, নিচে বাড়ীর ছাদে দাঁড়িয়ে বাচ্চা মেয়েটা দূরের পাহাড়টার পিছনে ধোঁয়া কালো সমুদ্রের ঢেউ এগিয়ে আসছে দেখছে।



এ জিনিস দেখার শেষ নেই, বাস এসে মুন্নারে দাঁড়িয়ে গেল। আমরা ওপর থেকে চুপচুপে ভেজা, ভিতর থেকে ঝরঝরে ফানুসের মত দুজন যেন সদ্য ঘুম থেকে ওঠা, দু চোখে লেগে থাকা আবেশ নিয়ে ছোট্ট হোটেলটার দিকে এগিয়ে চললাম। এই ছোট্ট হোটেল, গ্রীন ভিউ - হলিডে ইন-এ আমরা আগের বারও ছিলাম। হোটেলটা মুন্নার বাজার অঞ্চল থেকে এক কিলোমিটার দূরে, পাহাড়ের গায়ে, নির্জনে। যাঁরা হোটেল চালান, তারা দারুন ভালো মানুষ। তাই এবারে আর অন্য কোথাও বুকিংয়ের চেষ্টাও করিনি।
হোটেলে ঢুকে শুনি অনীকদারা আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তারা পৌঁছেছে কালকে। আমরাও চটপট বেরিয়ে পড়লাম। এখন যদি চান করে ভাত খাই তাহলে কোনো পাহাড় আমাকে বিছানা থেকে তুলতে পারবে না। বৃষ্টির কলকল করে রাস্তা ছাপানো জল থইথই করতে করতে আমরা একটু এগিয়ে দেখি অনীকদারা এসে নামল। বলে, চল লাঞ্চটা করে নিই। সে কি, তিনটে বাজে তোমরা এখনও খাওনি? ভাত খাবোনা খাবনা করেও, অতঃপর সেই ভাত, চার পাঁচ পদের নানা তরকারি, মাছভাজা সহযোগে লাঞ্চ করে হাই তুলতে তুলতে ছাতা মাথায় বাইরে এসে দাঁড়ালাম। বৃষ্টি তখন একটু ধরেছে। সামনেই একটা ইকো পার্কে বেড়াতে যাওয়া হল। মাটুপেত্তি, কুন্দালা, সার সার নয়ানভিরাম চা বাগান আমাদের আগেই ঘোরা, কালকে আজকে মিলিয়ে অনীকদারাও ঘুরে নিয়েছে, সুতরাং চল প্যান্ট গুটিয়ে, জোঁকের আতঙ্কে শিহরিত হতে হতে ইকো 'থিম' পার্ক। সাজানো আদিম পরিবেশ করার চেষ্টা হয়েছে, বৃষ্টি না পড়লে, বিকেল বেলায় গুচ্ছের চ্যাঁ-ভ্যাঁর মধ্যে সেই আদিমতা কতটা পাওয়া যেত জানি না, কিন্তু এই যে কুলকুল করে বৃষ্টির জল, ক্রমে ঝড়ঝড় করে, স্রোতের মত খলবল করে, মাঠ ডুবিয়ে, পা মাড়িয়ে চলছে, গাছের গোড়ায় ঝিঁঝিঁ ডাকছে, চারদিকে প্রাণীটি নেই, বিশাল বিশাল গাছের গুঁড়িরা মেঘের সঙ্গে মিলে অন্ধকার ঘনিয়ে এনেছে - এ দেখে আমাদের মন ভাল হয়ে গেল।
ফিরে এসে ড্রাইভারজীকে বললাম আত্তুকালটা টপ করে ঘুরে আসা যায় না। তিনি সানন্দেই  গেলেন। যাবার সময় এক জায়গায় থেমে ছিলাম আগেরবার। সেখান থেকে একটা চা বাগানের মধ্যে দিয়ে গিয়ে আত্তুকাল জলপ্রপাতের দারুন একটা দৃশ্য দেখেছিলাম। এবারও সেটা করার জন্য বলে শুনলাম, ওখানটা বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে একটু দূর থেকে একটা জায়গায় দুধের জায়গায় ঘোল পাওয়া যাবে। সেটাও মন্দ নয়।


জলপ্রপাতের ঠিক পাশে একটি বাড়ি আছে, তাঁরাই সামনেটাতে একটা চা কফির দোকান করেছেন, গতবারে টাইগার বলে একজন কুকুর শ্রেনীর জীবের সঙ্গে সেখানে আলাপ হয়েছিল। এবারে গিয়ে শুনলাম, টাইগার মারা গেছে। জলপ্রপাতের সামনে তো কিছু কথা বলা বা শোনা যায় না, তাই টাইগার আগেরবার কেমন বিস্কুট খাবার জন্য সবার সামনে দিয়েই গুঁড়ি মেরে লুকিয়ে লুকিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, সে সব নানা ভাবনায় ছেদ পড়তে পারল না। কিছুক্ষণ বসে বসে বর্ষাকালের আত্তুকালের মনমোহিনী দেখে কুয়াশায় কালচে নীল পথ পেরিয়ে হোটেলে চলে এলাম।


এই যে শোঁ-শোঁ করে সময় চলে যাচ্ছে, আমরা অসহায়ের মত শুধু দেখছি আর দেখছি, এ জিনিস এক জায়গায় বেশ কিছু বছর পর আবার আসলে বেশ বোঝা যায়। দেখার চোখে যত ঘনায় ছানির অমাবস্যা, তত বাড়ে দেখার ক্ষমতা, যত কাঁধ ঝুঁকে আসে, তত স্পষ্ট করে মাটিটা চিনতে পারা যায়, তারপর কোটি কোটি অসংখ্য প্রানের মত, টাইগারের মত, সব বোকামো, বুদ্ধি, হিংসা, ধর্ম এখানে ফেলে চলে  যেতে হয়। নিঃশব্দে! 

আমি জ্ঞান হবার পর দেখেছি বালিপুর। এলাহাবাদ ব্যাঙ্কে বাবা চাকরি করত, আর আমি তিনে পড়তে না পড়তেই,লাল জামা, কালো প্যান্ট পরে, গলায় টাই ঝুলিয়ে আনন্দমার্গ স্কুলে পড়তে যেতাম। কি পড়তাম জানি না, মানে এখন জানি না, মনে নেই, তা নয়, তখনও স্কুল থেকে ফেরার সময় মনে হত - কি শিখলাম রে বাবা আজ! মা জানতে তো চাইবেই, কি বলব? আমরা একটা দোতলা বাড়ির উপরের তলায় একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতাম। সেই তলাতেই আর একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকত রিম্পারা। রিম্পা আমার থেকে বছর খানেকের বড়, আনন্দমার্গেই পড়ত, সুতরাং ওর দায়িত্ব ছিল আমাকে বলে দেওয়া যে স্কুলে আজ কি কি হল। আমি ফিরে এসে ছানা খেতে খেতে সেগুলো মনে করে করে মা কে বলার চেষ্টা করতাম। মা অবশ্য শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে রিম্পাকে ডেকে জেনে নিত আজ কি হল, আর কালই বা কি লিখে নিয়ে যেতে হবে। তার সঙ্গে একটা প্রশ্নও করত যে আমি স্কুলে কি করি, আমার মনে থাকে না কেন, অন্যদের সঙ্গে গল্পে মশগুল থাকি কি! রিম্পা বলত, মানে সত্যি কথাই বলত যে, আমি মোটেই গল্প করি না, হাঁ করে বসে থাকি! 

সেই বালিপুরে, মা বিয়ের ঠিক পরেই গেছিল। অচেনা গ্রামে হঠাৎই আলুর ক্ষেতে দারুণ দেখতে একটি বাচ্চা মেয়েকে দেখে তার পরিবারের সঙ্গে এমন আলাপ শুরু হল যে অচিরেই তারা আমাদের যাবতীয় ঝক্কি সামলাতে লাগল। সকালে এসে আমাকে নিয়ে চলে গেল, বাবা অফিস চলে গেলে, মাও তালা লাগিয়ে চলে এল তাদের বাড়ি। বাবা বাজার যাবার আগে মাঠ থেকে তাজা সবজি চলে এল। সবচেয়ে বড় ব্যাপার নতুন জায়গায় একাকিত্ব মাকে আর তাড়া করতে পারল না। আমরা বছর দুয়েক পর বালিপুর ছেড়ে চলে এলাম, ধীরে ধীরে অনেক নিকটাত্মীয়র সঙ্গে যোগাযোগ আলগা হয়ে যেতে লাগল, কিন্তু এনাদের সঙ্গে সেই মাটির আমেজ আজও কিভাবে যেন একই রয়ে গেল। আর তিরিশ বছর পরে, ওনাদের নিকানো উঠোনে হামাগুড়ি দিত যে বাচ্চা ছেলে, সে বউকে নিয়ে তার শৈশব দেখাতে নিয়ে গেল। 

আমরা যে বাড়িতে থাকতাম, সেখানে জরির কাজ করছেন কিছু মানুষ। যে লম্বা ব্যালকনিতে বসে আমি আর রিম্পা একটা ছাতা ভেঙ্গে ফেলেছিলাম, তার কোনে কোনে পানের লাল দাগ। রিম্পাদের ঘরের দরজায় বসে আছে কিছু অচেনা লোক। কিন্তু বারান্দার গন্ধটা একইরকম, পিছনের মাঠটা একইরকম, ভিডিও হল উঠে গিয়ে কোচিং দেওয়ার ঘরের রাস্তার উপর এসে পড়াটা একইরকম। বাবা মায়েরা অবশ্য বলছিল, এখানে ঐটা আর নেই, আরে এটা এখানে কি হয়েছে, ইত্যাদি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, এইতো এই রাস্তাটা এবার ডানদিকে মোড় নেবে, তারপর একটা দোতলা বাড়ি, তারপর স্কুল। এমনকি মোড়ের মাথায় দোকানে সাইকেল দাঁড় করিয়ে যে লোকটি টুলে বসে আছে, অঙ্ক পরীক্ষার দিন সে অবিকল ওভাবেই ওখানে বসে ছিল। এরকমই আলো ছায়া হয়ে ছিল জায়গাটা, আর আমি নারকোল তেলের গন্ধ পাচ্ছিলাম। নারকোল তেলের গন্ধ মানেই স্কুল এসে গেল, কারণ স্কুলের ঢোকার মুখে তেলের কল ছিল। আমার সে স্কুল এখন আর ওখানে নেই, কিন্তু আমি জানি, আজও ওই ঘরের ভিতরে বড় ফ্রেমের চশমার হাসিমুখের মাস্টারমশাই বসে আছেন, আমি গেলেই বসার বেঞ্চিটা দেখিয়ে দেবেন। 

আমার বন্ধুর (বৌয়ের) কেমন লেগেছে জায়গাটা সেটা সে একটা লেখায় বিস্তারিত লিখেছে। তার সেই থেকেই আমার মনে হল, আমার শৈশব শুধু আমার কাছে সুন্দর লেগেছে তা নয়, জায়গাটাতে হয়ত সত্যিই খনিজ সম্পদ আছে। খননের কাজ চলতেই পারে।

একটা গল্পে পড়েছিলাম যে, একটি লোককে চোর বলে সবাই সন্দেহ করছে, ঘিরে ধরেছে, একজন মাতব্বর গেছে ডান্ডা আনতে। ইতিমধ্যে, জানা গেছে লোকটি চোর নয়, নিপাট ভালোমানুষ। পাবলিকের সিমপ্যাথি তার দিকে। কিন্তু ওদিকে সেই মাতব্বর ফিরে এসেছে, সে এসবের কিছুই জানে না, এসে সটান লোকটাকে লাগিয়েছে এক ঘা। পাবলিক ক্ষেপে আগুন, এটা কি হল? মাতব্বর অবাক ! যে প্রশ্ন সে চোর কে করতে যাবে, অবিকল সেই প্রশ্ন তাকে করা হচ্ছে কেন। 

আমাদের বর্তমান সময়ে যে পরশ্রীকাতরেরা আমাদের চারপাশে ঘোরাঘুরি করছে, তাদের কিছু কথা তো আগের পোস্টে লিখলাম। কিন্তু একটা শ্রেণীবিভাগ করার কথা ভুলে গেছিলাম। এদের মধ্যে একদল চালাক একদল গর্ধভ। এই গর্ধভেরা যে লেখাটার সোজাসুজি কথা গুলো বুঝে বেজায় রেগে যাবে, তা প্রত্যাশিতই ছিল। যেটা আক্ষেপ সেটা হল যে, আরও অনেক কিছু যে বলেছিলাম সেটা বোঝার মত মাথা যে এদের নেই, যা বলার অ আ ক খ করে বলা উচিত ছিল , সেটা মাথায় রাখা উচিত ছিল। 

এখন দুটো জিনিস করা যায়, তাকে ভালোভাবে না বলে তার পন্থায় গালাগালি দেওয়া যায়।  দুই তাকে আরও কিছু সূত্র দেওয়া যায়, শেষ প্রচেষ্টা, যদি পদ্মফুল ফোটে !

সে বলেছে আমরা মেকি মহান, সামজিক ব্যাপারে ফালতু লেখালিখি করি, কাজের মুরোদ নেই, সব বিষয়ে নেতিবাচক ভঙ্গি আমাদের, ফেসবুক দিয়ে প্রচুর কাজের কাজ যে হয় তা আমরা জানি না ! এত অনেকটা সেই রাহুল গান্ধীর ইন্টারভিউ এর মত হল। যতই অনর্ব গোস্বামী তাকে গভীরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তত সে খোসাটা নিয়ে নাড়াচাড়া করে। আরে ভাই, তোমাকে বলা হয়েছে, আমি দেখেছি তুমি নিমন্ত্রণ করে নিজে খেতে বসে যাও। ভাবো, ভেবে দ্যাখো যে কথাটা শুধু 'আমি দেখেছি' বলা হয়েছে মানেই যে অন্য লোকের সঙ্গে হয়েছে তা নাও হতে পারে। উদাহরণ  টেনে এনে একটু মোলায়েম করা হয়েছে। সেটা ঘটে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলো। তারপর, ফেসবুক। ওফ। আমার পরিচিত লেখক লিখেছিলেন যে বেশিরভাগ লোক ফেসবুকে যে সব আপডেট দেয় তা থেকে তাদের প্রকৃতিটা জানা যেতে পারে। এ আপডেট দেয়, আবার কাজও করে; এ কাজ করে, নিঃশব্দে; এ শুধু আপডেট দেয়, কাজের সময় লবডঙ্কা, ইত্যাদি। তো আমাদের এই সহজ মানুষ এতই 'ইয়ে', যে এটা পড়ে তার মনে হয়েছে লেখক নিরাশাবাদী। এর চেয়ে বড় জানালা দিয়ে উঁকি মারা, ঈর্ষা করার উদাহরণ দেওয়া সম্ভব নয়। এই ভীষণ সহজ লোকটাই একবার সেই ফেসবুকে এক রাজনৈতিক মন্তব্যের উপর সম্পূর্ন উল্টো মন্তব্য করেছিল। অন্য একজন তাকে বলেছিল, ভাই তুই চুপ কর, তুই ব্যাপারটা বুঝতেই পারিসনি। তাতেও সহজ মানুষটি রেগে লাল, আমি ঠিকই বুঝেছি। অতঃপর সবাই তাকে বোঝানোর চেষ্টা না করে নিজেদের মত কথা চালিয়ে যায়।

এই যে আপনার সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে ঈর্ষা করার হলুদ স্বভাব, এরও একটা নড়বড়ে যুক্তি সে খাড়া করবার চেষ্টা করবে। সে বলবে এ সব কাকতালীয়, আমার সময় নেই তোমাকে কপি করার। তা, কাকতালীয় একবার হয়, দুবার হয়, হতেই থাকবে এ কেমন সমাপতন! আর সেই সমাপতন আর কারোর সঙে আমার হচ্ছে না কেন! এ সব অবশ্য তার ভাবার সময় নেই, বা স্বীকার করার সৎসাহস নেই, বা কোনটাই নেই।

এই লোকটি বলেছে যে সে নাকি  নিন্দার কথা বলে আসলে শ্রদ্ধার ডালি নিয়ে এসেছিল। এই হয়। সে নিজে এসে কি করে জীবন যাপন করতে হয় সে নিয়ে লাগাতার খুঁচিয়ে গেছে, দিনের পর দিন। শ্রদ্ধা দূর অস্ত, মুখের ওপর অভদ্রতা করেছে, কি না দুজন মানুষ বলেছিল আমরা নিজেদের মত থাকতে পছন্দ করি।  এটা ইগো নয়, সংকীর্ণতা নয়, স্রেফ আমার ইচ্ছে। আমরা মহান হবার জন্য বা লোকেদের থেকে আলাদা প্রমান করার জন্য একলা থাকতে চাইনি। আমার ইচ্ছে করেছে তাই নিজের মত থাকতে চেয়েছি। কিন্তু সামনে, পিছনে, কথায়, আচরণে সব সময় যদি একজন বলে তোমরা ভুল করছ, তাকে একদিন বলতেই হয় এবার তুমি এস। আমাকে খোঁচানো ছাড়ো। তাতে আমার বই যদি ঘর সাজানোর উপকরণ হয় তো হোক, আমার গায়ে কাদা লাগে তো লাগুক, অন্ততঃ একদিন কাদা লাগিয়ে এরপর শান্তিতে একলা থাকা যাবে।

তবে এটা কিন্তু খুব আগ্রহের ব্যাপার যে যারা এসব আচরণ করে প্রতিবাদ করলে তাদের যুক্তিটা ঠিক কি হয়। আপনি নতুন রান্না করলেন, সেও অবিকল একই রান্না করল। আপনি বললেন এ কি রে বাবা, এরকম করে কেন! সে বলবে, কেন, তুমি কি একাই রান্না করতে জান। আর কি কেউ জানে না। সবাই বলবে হ্যাঁ, হতেও পারে কোনভাবে ব্যাপারটা মিলে গেছে। তারপর আপনি আপনার বাচ্চার জন্য ভিডিও গেমস কিনবেন। সাধারণ লোকে কি বলবে  জানতে পারলে, বাঃ, ভালো ব্যাপার। এ কিন্তু বলবে, হ্যাঁ, ভিডিও গেম আর কি আছে, ও আমরা অনেক খেলেছি। এই এক হুজুগ হল, কদ্দিন চলে দেখি। তারপর একদিন নিজেই একটা কিনে আনবে। আপনি বলবেন, আবার মিলে গেল! এ বলবে, কেন দুনিয়ার সব জিনিস কি আপনার একার নাকি। আপনি বলবেন, তা নয়, কিন্তু সেদিন আপনি এমন নাক কুঁচকালেন -। লোকে বলবে, ঠিক আছে, এবারও হতে পারে কোনোভাবে মিলে গেছে, যাকগে যাক। কিন্তু তারপর - হু হু বাবা, আপনি নড়লে, সেও নড়তে লাগল; আপনি সামাজিক মন্তব্য করলে বলল, এঃ দ্যাশের জন্য ভাবনায় ঘুম হচ্ছে না।  আপনি বললেন, দাদা যে অভিযোগ আপনি আমার বিরুদ্ধে করছেন যে আমি সব বিষয়ে আপনার দোষ খুঁজে পাই, কই আমি তো আপনার সামাজিক অসামাজিক কোনো কাজের বা মন্তব্যর বিষয়ে কোনো কথা বলি নি। আমি এমনও বলিনি যে আমার রাস্তাই রাস্তা, সবাই নিজের নিজের মত থাক। আপনি গায়ে পড়ে আপনার মতটা আমার ঘাড়ে চাপাচ্ছেন যখন তখন তো এটা পরিস্কার যে মহান হবার চেষ্টা আসলে আপনার, ইগো যদি থাকে সেটা আপনার। আমি শুধু দিনের পর দিন আপনার মতামতের প্রবাহ শুনতে চাইনি। সে বললে, সেটা বলার ভাষা আছে, আপনি তো এত স্পস্ট করে না বলে একটু ভদ্রতাও করতে পারতেন। তখন আপনাকে সেই অপ্রিয় সত্যটা বলেতেই হবে যে, স্পস্ট করে বলতে না পেরে আকারে ইঙ্গিতে আপনাকে যথেস্ট বোঝানোর চেষ্টা আমি করেছি। আপনি তো বোঝেনই নি, উল্টে কেন আমাকে  লোকমুখে আমার সম্পর্কে এত কথা শুনতে হল বলে বাড়ি বয়ে ঝগড়া করেতে এসেছেন। আমাকে উল্টে বোঝাতে এসেছেন যে আমাদের রাস্তা যে ভূল সেটা সময়ই বলবে। আমার শুধু একটা কথা। তাহলে এটা বলবেন না যে আমরা নিজেদেরকে নিয়ে উচ্চ ভাবনায় অন্ধ, পাঁকে নিমজ্জিত, কারণ আমরা কখনও দাবী করিনি আমাদের পথটাই ঠিক, সেই দাবী আপনার। সেটা ফলল কিনা সেটা দেখার ইচ্ছে আপনি প্রকাশ করেছেন, আমি জানি না আমার পথ ঠিক না ভূল, আপনার সঙ্গে কোনো আলোচনা চাইনা, শুধু নিজেদের মত থাকতে চাই। তাই, শেষবারের মত, DON'T INTERFERE PLEASE!

"এই দেহ দেহ দেহ, ঠিক এই কথা আমারে তুলসী জিগায়ছিল। আমি বললাম, বলি ও তুলসী, ভোগ না হইলে তো তোমার নিবৃত্তি হইব্য না। তার রামায়ণ লেখা শেষ হলে তাকে রাজা মানসিংহ করে দিলুম। বললাম কত ভোগ করবি কর।"

এই সদিচ্ছাটা আমার যে কতবার হয়েছে বলবার নয়। ছোটোবেলা থেকে শেখানো হয়েছে টপকে যাও, পেরিয়ে যাও, জিতে দেখাও - মানে সোজা কথায় অন্যকে মেরে বেঁচে থাক। যারা আবার বলে আমার বাড়িতে কিন্তু কক্ষনও বাবা মা আমাকে এসব বলে নি, আবহাওয়াটাই অন্যরকম ছিল - তারা জানিনা কেন, হয়ত জীবনের নানা পরিস্হিতির 'দোষে' নিজেরাই সহজ প্রবৃত্তিটা শিখে নিয়েছে। পরিস্হিতির দোষে, কারণ তারা মনে করে জীবনে তাদের মত গুটিকয় লোকেরা কখনো সুযোগ পেল না, আর বাকি সবাই ঝুড়ি ঝুড়ি সুযোগ পেয়ে পায়ের উপর পা তুলে উন্নতি করে ফেলল। এই সমস্ত লোকেরা চারপাশে অবিরত ঘ্যানঘ্যান করবে আর আপনি চান বা না চান আপনার সঙ্গে অকারণ ঈর্ষা করে যাবে। তখন আপনার মনে হবেই, এর রামায়ণ শেষ হলে এ যেন অনতিবিলম্বে মানসিংহ হয়ে যায়। ও বাঁচবে আমিও বাঁচব।
অবশ্য পরশ্রীকাতরতা এমন সুলভ একটা জিনিস যে খুব সাবধানে প্রতিদিন সাবান মেখে চান না করলে আপনার গায়েও এসে জমবে, আর কিছুদিনের মধ্যেই আপনি এমনকি বন্ধুর ফেসবুক প্রোফাইল দেখেও জ্বলতে আরম্ভ করবেন। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ছবি লাগিয়েছে, বিশাল ফটোগ্রাফার হয়েছে! অ্যাই, তোরা আমার একটা ছবি তুলে দে তো, আমিও ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট করে লাগাবো। কলিগ প্রোমোশন পেলে ভাববেন, ওই গাধার মত খাটতেই পারে, ঘটে বুদ্ধি বলে তো কিছু নেই। বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা, আমি এমনও পাবলিক দেখেছি, যে লোককে নিমন্ত্রণ করে তার জন্য অপেক্ষা না করে নিজে খেতে বসে গেছে। কি যুক্তি দেখাচ্ছে না, দেরি করে এসে খুব কাজ দেখাচ্ছে, ও একাই যেন কাজ করে! ভাবুন! এদের কি পরশ্রীকাতর বলবেন না কি ছোটলোক বলবেন ?
ভাবছেন হয়ত এদের দরকার নিবৃত্তিমার্গ। মানসিংহ হলেই এদের ভোগের ক্ষিদে মিটবে। কদাপি না। এদের যে বিশ্বব্যাপী সংকট। মানসিংহ হলেই ভাববে কত কষ্ট করে আমি তবে রাজা হলুম, আর অন্যরা কেমন দোলনায় দুলতে দুলতে রাজা হয়ে গেছে। আমার কষ্ট আমাদের মত ভাগ্যহীনেরাই কেবল বুঝবে। এরকম ভাববার কারণ এরা নিজেরা কখনো তো নিজেদের চিন্তায় স্থির নয়, ভালো করে ভেবে ওঠবার আগেই নিজেকে প্রমাণ করতে সময় নষ্ট করে ফেলে। আপনি চুপ করে বসে থাকলে বলবে, উঠে এস, সকলের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নাও। আপনি বলবেন কেন বাপু, আমি তো বেশ আপনমনে গান গাইছিলাম। তারা রেগে যাবে, ভাববে এবং প্রমাণ করতে লেগে যাবে যে আপনি সংকীর্ণমনা। আবার তার বন্ধুর সঙ্গে যখন সে সময় কাটাবে তখন সে যুক্তি দেখাবে এসব হইচইয়ে এসে কি হবে। 'একটু নিজের মত থাকতে' সে এমনকি অফিস কামাই করার ফিকির খুঁজে বার করবে। অন্য লোক তার হয়ে হাজিরা খাতায় সই করে দেবে।  আবার হঠাৎ একদিন উপযাচক হয়ে গম্ভীর মুখে আপনাকে 'সৎ' জীবন যাপনের উপর গুচ্ছের জ্ঞান দিয়ে দেবে। তাই এরা কখনও সুস্থির হবে না, আপনাকেও নিজের মত থাকতে দেবে না। অসভ্যের মত আপনার ব্যক্তিগত জীবনযাপনের সমস্ত ব্যাপারে জানলা দিয়ে উঁকি মারবে, কমেন্ট করবে, অন্ধকারে বসে থাকলে মুখে টর্চ মারবে, আর আপনি প্রতিবাদ করলেই - আমরা ভাগ্যহীন বলে কাঁদুনি গাইতে লেগে যাবে। 
আপনি বাস পেলেন, ও পেলনা। ভাগ্যহীন! আপনি বাস পেলেননা, অটো পেলেন। আবার ও ভাগ্যহীন! আপনাকে ভিড় সহ্য করতে হলনা। আরে আমি তো রোদে আধঘন্টা দাঁড়িয়ে তবে অটো পেলাম। আরে ছাড়ো, আমি বাসের জন্যই প্রতিদিন একঘন্টা - মানে ডেফিনেটলি আধঘন্টার বেশি দাঁড়াই। একটা সিনেমার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে যেখানে নিজে বড় প্রমাণ করার জন্য একজন বলেছিলেন, কি আপনার মেয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছে। এ তো কিছুই নয়, আমার মেয়ে বিয়ে করে পালিয়ে গেছিল। এহেন লোকেদের কষ্টের পরিমাপ করতে যাবার তো চেষ্টা করতেই নেই, সহানুভূতিও জানাতে নেই। এদের যদি মেসোমশাইয়ের পেট খারাপ হয়, তাহলে যতক্ষণ না আপনারও মেসোমশাইয়ের পেট খারাপ হচ্ছে ততক্ষণ আপনি ধরতেই পারবেন না যে মেসোমশাইয়ের পেট খারাপ হওয়া কি জিনিস। সুতরাং সাধারণ ব্যবহারিক ভদ্রতাটুকু করতে গেছ কি ভালোমানুষীর মুখোশের ফর্দাফাই, আগে তোর হোক তারপরে বুঝবি। এঃ আহা বলতে এসেছে ! 

তারপর আর কি, এদের তো আর বিরিঞ্চিবাবা মানসিংহ করে দিলেন না, তাই নিজের নিজের দুর্ভাগ্যের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকুন অগত্যা। আপনি না থাকলেও অন্ততঃ এরা থাকবে। তবে এতদিন পর্য্যন্ত আপনার জীবনে যে কোনো ঝড়ঝাপটা আসেনি কেন, কে জানে !

প্রায় তিন বচ্ছর হতে চলল হরিয়াণায় আছি। প্রত্যক্ষ ভাবে এখানের কোনো গ্রামের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। আর সারাবছর নানা রকম ঘটনার কথা শুনে বেশী যোগাযোগ না থাকাটাই বাঞ্ছিত বলে মনে হয়। আমাদেরকে একটা পাহাড়ের ধারে জঙ্গল কেটে ক্যাম্পাস বানিয়ে সিকিউরিটি গার্ডের সুরক্ষায় রেখেছে। একবার অবশ্য পাশের গ্রামের কিছু ছেলে একটি অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করেছিল।  তবে অবাঞ্ছিত ঘটনা তো আলাদা করে হরিয়াণায় নয়, সর্বত্র হচ্ছে। তাই আজ তিন বছর পরে দেখছি বিকৃত মানসিকতার তুলনায় ঠিকঠাক ও ভালো মানসিকতাই হরিয়াণা আমাদেরকে দিয়ে আসছে। সে অটো ড্রাইভার থেকে শুরু করে গ্রামের হাটে বাজারে নানা মানুষজন। সময় বয়ে যাচ্ছে, যেমনটা পশ্চিমবঙ্গে যেত। হয়ত এখানে রাত বারোটায় গাড়ি থেকে মদ্যপেরা মেয়েদের সঙ্গে আসার প্রস্তাব দিচ্ছে, কলকাতায় তারা গাড়ি থেকে দেখছে আর ভাবছে। এই তো।
গত ৮ই মার্চ কোনরকম পূর্বাভাস না দিয়ে হুড়মুড় করে হরিয়ানায় এসে পড়ল শিলাবৃষ্টি। রুক্ষ এলাকা। সবাই ঝড় বলতে বোঝে ধূলো, বৃষ্টির একটু আর্দ্রতা পেলেই ময়ূর ডেকে ওঠে। ব্যালকনিতে ট্রাইপড রেখে সেই বৃষ্টিমাখা ঝড়ের ছবি তুলে ফেললাম উৎসাহর বশে। শেষ পর্যন্ত তোলা গেল না, কারণ গালের উপর ঠাশ করে এসে পড়ল একটি প্রমাণ সাইজের শিলা। বাকি সময়টা গালের শুশ্রষায় কেটে গেল!



পশ্চিমবাঙলায় থাকা লোককে হরিয়ানায় এনে ফেললে সে লোক অযাচিত মেঘ দেখে উছ্বসিত হবেই, তারপর আবার যদি শীতটা হঠাৎ ফেব্রুয়ারির শেষে চলে যাব বলে, আর মেঘ বৃষ্টি সেটাকে মার্চের শেষ পর্যন্ত ঠেলে দেয়, তাহলে সে তার আনন্দের পরিমাপ থাকবে কি?



কাজের শেষে সূর্যাস্তে ভাগ বসানোর কোনো রাস্তার মোড় নেই, বাড়ী ফেরবার তাড়া নেই, ট্রাফিক নেই। কাজ করতে করতেই চায়ের কাপ নিয়ে সূর্যাস্ত দেখতে সোজা ছাদে -

 
অবসরে । ২০১৪ ।