"এই দেহ দেহ দেহ, ঠিক এই কথা আমারে তুলসী জিগায়ছিল। আমি বললাম, বলি ও তুলসী, ভোগ না হইলে তো তোমার নিবৃত্তি হইব্য না। তার রামায়ণ লেখা শেষ হলে তাকে রাজা মানসিংহ করে দিলুম। বললাম কত ভোগ করবি কর।"
এই সদিচ্ছাটা আমার যে কতবার হয়েছে বলবার নয়। ছোটোবেলা থেকে শেখানো হয়েছে টপকে যাও, পেরিয়ে যাও, জিতে দেখাও - মানে সোজা কথায় অন্যকে মেরে বেঁচে থাক। যারা আবার বলে আমার বাড়িতে কিন্তু কক্ষনও বাবা মা আমাকে এসব বলে নি, আবহাওয়াটাই অন্যরকম ছিল - তারা জানিনা কেন, হয়ত জীবনের নানা পরিস্হিতির 'দোষে' নিজেরাই সহজ প্রবৃত্তিটা শিখে নিয়েছে। পরিস্হিতির দোষে, কারণ তারা মনে করে জীবনে তাদের মত গুটিকয় লোকেরা কখনো সুযোগ পেল না, আর বাকি সবাই ঝুড়ি ঝুড়ি সুযোগ পেয়ে পায়ের উপর পা তুলে উন্নতি করে ফেলল। এই সমস্ত লোকেরা চারপাশে অবিরত ঘ্যানঘ্যান করবে আর আপনি চান বা না চান আপনার সঙ্গে অকারণ ঈর্ষা করে যাবে। তখন আপনার মনে হবেই, এর রামায়ণ শেষ হলে এ যেন অনতিবিলম্বে মানসিংহ হয়ে যায়। ও বাঁচবে আমিও বাঁচব।
অবশ্য পরশ্রীকাতরতা এমন সুলভ একটা জিনিস যে খুব সাবধানে প্রতিদিন সাবান মেখে চান না করলে আপনার গায়েও এসে জমবে, আর কিছুদিনের মধ্যেই আপনি এমনকি বন্ধুর ফেসবুক প্রোফাইল দেখেও জ্বলতে আরম্ভ করবেন। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ছবি লাগিয়েছে, বিশাল ফটোগ্রাফার হয়েছে! অ্যাই, তোরা আমার একটা ছবি তুলে দে তো, আমিও ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট করে লাগাবো। কলিগ প্রোমোশন পেলে ভাববেন, ওই গাধার মত খাটতেই পারে, ঘটে বুদ্ধি বলে তো কিছু নেই। বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা, আমি এমনও পাবলিক দেখেছি, যে লোককে নিমন্ত্রণ করে তার জন্য অপেক্ষা না করে নিজে খেতে বসে গেছে। কি যুক্তি দেখাচ্ছে না, দেরি করে এসে খুব কাজ দেখাচ্ছে, ও একাই যেন কাজ করে! ভাবুন! এদের কি পরশ্রীকাতর বলবেন না কি ছোটলোক বলবেন ?
ভাবছেন হয়ত এদের দরকার নিবৃত্তিমার্গ। মানসিংহ হলেই এদের ভোগের ক্ষিদে মিটবে। কদাপি না। এদের যে বিশ্বব্যাপী সংকট। মানসিংহ হলেই ভাববে কত কষ্ট করে আমি তবে রাজা হলুম, আর অন্যরা কেমন দোলনায় দুলতে দুলতে রাজা হয়ে গেছে। আমার কষ্ট আমাদের মত ভাগ্যহীনেরাই কেবল বুঝবে। এরকম ভাববার কারণ এরা নিজেরা কখনো তো নিজেদের চিন্তায় স্থির নয়, ভালো করে ভেবে ওঠবার আগেই নিজেকে প্রমাণ করতে সময় নষ্ট করে ফেলে। আপনি চুপ করে বসে থাকলে বলবে, উঠে এস, সকলের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নাও। আপনি বলবেন কেন বাপু, আমি তো বেশ আপনমনে গান গাইছিলাম। তারা রেগে যাবে, ভাববে এবং প্রমাণ করতে লেগে যাবে যে আপনি সংকীর্ণমনা। আবার তার বন্ধুর সঙ্গে যখন সে সময় কাটাবে তখন সে যুক্তি দেখাবে এসব হইচইয়ে এসে কি হবে। 'একটু নিজের মত থাকতে' সে এমনকি অফিস কামাই করার ফিকির খুঁজে বার করবে। অন্য লোক তার হয়ে হাজিরা খাতায় সই করে দেবে। আবার হঠাৎ একদিন উপযাচক হয়ে গম্ভীর মুখে আপনাকে 'সৎ' জীবন যাপনের উপর গুচ্ছের জ্ঞান দিয়ে দেবে। তাই এরা কখনও সুস্থির হবে না, আপনাকেও নিজের মত থাকতে দেবে না। অসভ্যের মত আপনার ব্যক্তিগত জীবনযাপনের সমস্ত ব্যাপারে জানলা দিয়ে উঁকি মারবে, কমেন্ট করবে, অন্ধকারে বসে থাকলে মুখে টর্চ মারবে, আর আপনি প্রতিবাদ করলেই - আমরা ভাগ্যহীন বলে কাঁদুনি গাইতে লেগে যাবে।
আপনি বাস পেলেন, ও পেলনা। ভাগ্যহীন! আপনি বাস পেলেননা, অটো পেলেন। আবার ও ভাগ্যহীন! আপনাকে ভিড় সহ্য করতে হলনা। আরে আমি তো রোদে আধঘন্টা দাঁড়িয়ে তবে অটো পেলাম। আরে ছাড়ো, আমি বাসের জন্যই প্রতিদিন একঘন্টা - মানে ডেফিনেটলি আধঘন্টার বেশি দাঁড়াই। একটা সিনেমার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে যেখানে নিজে বড় প্রমাণ করার জন্য একজন বলেছিলেন, কি আপনার মেয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছে। এ তো কিছুই নয়, আমার মেয়ে বিয়ে করে পালিয়ে গেছিল। এহেন লোকেদের কষ্টের পরিমাপ করতে যাবার তো চেষ্টা করতেই নেই, সহানুভূতিও জানাতে নেই। এদের যদি মেসোমশাইয়ের পেট খারাপ হয়, তাহলে যতক্ষণ না আপনারও মেসোমশাইয়ের পেট খারাপ হচ্ছে ততক্ষণ আপনি ধরতেই পারবেন না যে মেসোমশাইয়ের পেট খারাপ হওয়া কি জিনিস। সুতরাং সাধারণ ব্যবহারিক ভদ্রতাটুকু করতে গেছ কি ভালোমানুষীর মুখোশের ফর্দাফাই, আগে তোর হোক তারপরে বুঝবি। এঃ আহা বলতে এসেছে !
তারপর আর কি, এদের তো আর বিরিঞ্চিবাবা মানসিংহ করে দিলেন না, তাই নিজের নিজের দুর্ভাগ্যের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকুন অগত্যা। আপনি না থাকলেও অন্ততঃ এরা থাকবে। তবে এতদিন পর্য্যন্ত আপনার জীবনে যে কোনো ঝড়ঝাপটা আসেনি কেন, কে জানে !
No comments:
Post a Comment