আমি জ্ঞান হবার পর দেখেছি বালিপুর। এলাহাবাদ ব্যাঙ্কে বাবা চাকরি করত, আর আমি তিনে পড়তে না পড়তেই,লাল জামা, কালো প্যান্ট পরে, গলায় টাই ঝুলিয়ে আনন্দমার্গ স্কুলে পড়তে যেতাম। কি পড়তাম জানি না, মানে এখন জানি না, মনে নেই, তা নয়, তখনও স্কুল থেকে ফেরার সময় মনে হত - কি শিখলাম রে বাবা আজ! মা জানতে তো চাইবেই, কি বলব? আমরা একটা দোতলা বাড়ির উপরের তলায় একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতাম। সেই তলাতেই আর একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকত রিম্পারা। রিম্পা আমার থেকে বছর খানেকের বড়, আনন্দমার্গেই পড়ত, সুতরাং ওর দায়িত্ব ছিল আমাকে বলে দেওয়া যে স্কুলে আজ কি কি হল। আমি ফিরে এসে ছানা খেতে খেতে সেগুলো মনে করে করে মা কে বলার চেষ্টা করতাম। মা অবশ্য শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে রিম্পাকে ডেকে জেনে নিত আজ কি হল, আর কালই বা কি লিখে নিয়ে যেতে হবে। তার সঙ্গে একটা প্রশ্নও করত যে আমি স্কুলে কি করি, আমার মনে থাকে না কেন, অন্যদের সঙ্গে গল্পে মশগুল থাকি কি! রিম্পা বলত, মানে সত্যি কথাই বলত যে, আমি মোটেই গল্প করি না, হাঁ করে বসে থাকি!
সেই বালিপুরে, মা বিয়ের ঠিক পরেই গেছিল। অচেনা গ্রামে হঠাৎই আলুর ক্ষেতে দারুণ দেখতে একটি বাচ্চা মেয়েকে দেখে তার পরিবারের সঙ্গে এমন আলাপ শুরু হল যে অচিরেই তারা আমাদের যাবতীয় ঝক্কি সামলাতে লাগল। সকালে এসে আমাকে নিয়ে চলে গেল, বাবা অফিস চলে গেলে, মাও তালা লাগিয়ে চলে এল তাদের বাড়ি। বাবা বাজার যাবার আগে মাঠ থেকে তাজা সবজি চলে এল। সবচেয়ে বড় ব্যাপার নতুন জায়গায় একাকিত্ব মাকে আর তাড়া করতে পারল না। আমরা বছর দুয়েক পর বালিপুর ছেড়ে চলে এলাম, ধীরে ধীরে অনেক নিকটাত্মীয়র সঙ্গে যোগাযোগ আলগা হয়ে যেতে লাগল, কিন্তু এনাদের সঙ্গে সেই মাটির আমেজ আজও কিভাবে যেন একই রয়ে গেল। আর তিরিশ বছর পরে, ওনাদের নিকানো উঠোনে হামাগুড়ি দিত যে বাচ্চা ছেলে, সে বউকে নিয়ে তার শৈশব দেখাতে নিয়ে গেল।
আমরা যে বাড়িতে থাকতাম, সেখানে জরির কাজ করছেন কিছু মানুষ। যে লম্বা ব্যালকনিতে বসে আমি আর রিম্পা একটা ছাতা ভেঙ্গে ফেলেছিলাম, তার কোনে কোনে পানের লাল দাগ। রিম্পাদের ঘরের দরজায় বসে আছে কিছু অচেনা লোক। কিন্তু বারান্দার গন্ধটা একইরকম, পিছনের মাঠটা একইরকম, ভিডিও হল উঠে গিয়ে কোচিং দেওয়ার ঘরের রাস্তার উপর এসে পড়াটা একইরকম। বাবা মায়েরা অবশ্য বলছিল, এখানে ঐটা আর নেই, আরে এটা এখানে কি হয়েছে, ইত্যাদি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, এইতো এই রাস্তাটা এবার ডানদিকে মোড় নেবে, তারপর একটা দোতলা বাড়ি, তারপর স্কুল। এমনকি মোড়ের মাথায় দোকানে সাইকেল দাঁড় করিয়ে যে লোকটি টুলে বসে আছে, অঙ্ক পরীক্ষার দিন সে অবিকল ওভাবেই ওখানে বসে ছিল। এরকমই আলো ছায়া হয়ে ছিল জায়গাটা, আর আমি নারকোল তেলের গন্ধ পাচ্ছিলাম। নারকোল তেলের গন্ধ মানেই স্কুল এসে গেল, কারণ স্কুলের ঢোকার মুখে তেলের কল ছিল। আমার সে স্কুল এখন আর ওখানে নেই, কিন্তু আমি জানি, আজও ওই ঘরের ভিতরে বড় ফ্রেমের চশমার হাসিমুখের মাস্টারমশাই বসে আছেন, আমি গেলেই বসার বেঞ্চিটা দেখিয়ে দেবেন।
আমার বন্ধুর (বৌয়ের) কেমন লেগেছে জায়গাটা সেটা সে একটা লেখায় বিস্তারিত লিখেছে। তার সেই থেকেই আমার মনে হল, আমার শৈশব শুধু আমার কাছে সুন্দর লেগেছে তা নয়, জায়গাটাতে হয়ত সত্যিই খনিজ সম্পদ আছে। খননের কাজ চলতেই পারে।
No comments:
Post a Comment