সব স্বপ্নের বিভীষণ

No comments:
 
এই পারফিউম আর মাছের গন্ধের ব্যাপারটা অনেকদিন ধরেই বিভীষণ খেয়াল করেছে। যখন প্রথম প্রথম দেখাসাক্ষাৎ, মেলামেশা তখন বীথী একটা সস্তা সেন্ট মাখত মাঝে মাঝে। নাক জ্বালা করত বিভীষণের, কেবিনের আলো-আঁধারিতে ফিসফ্রাই খেতে খেতে একদিন ওক করার পর আর মাখেনি। এখন অবশ্য ক্যারন, ক্লাইভ ক্রিশ্চিয়ান এসব ব্যবহার করে। বিকেলের লেখার পাট চুকিয়ে, দক্ষিনের বারান্দায় স্কচ খুলে বসলেই বেডরুম থেকে প্রবল গন্ধগুলো ভেসে আসে। মাঝে মাঝে সে উঠে গিয়ে জানলা দিয়ে বীথীকে লক্ষ্য করে, রোজ একজন মানুষ কেমন করে পরতে পরতে গায়ে গন্ধ মাখে সেটা বোঝার চেষ্টা করে। বীথী দেখতে পেলে খুশি হয়।

আজ অন্যদিনের তুলনায় গন্ধটা একটু কম দশাসই মনে হলেও, এই বারান্দার চেয়ার ছেড়ে ওঠা যাবে না। আজ অন্তত দুম করে হঠকারী চিন্তাভাবনার দিন নয়। সামনে একটা অর্ধসমাপ্ত প্রবন্ধ, পাশে একটা ঈষৎ উষ্ণ স্মার্টফোন। একটা বিরুদ্ধ প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে প্রকাশ সিনহার কেসটা নিয়ে। প্রকাশ সিনহা এমনিতে বেশ কারিগর লোক, কিন্তু আজকের পনেরো মিনিটের কথোপকথনে মনে হল যেন বেশ ভয় পেয়েছে। এমতাবস্থায়, জনচেতনার শহুরে অংশের চোখে একটা উল্টোমত, সিনহার একটা নিরাপরাধ, বেচারি মুখটার প্রতিষ্ঠা করে দিতে হবে। আজ রাতের মধ্যে ড্রাফটা বানিয়ে আনন্দবাজারের রায়কে আবার একবার ধরতে হবে। আজকে আর ছাড়া যাবে না, কমিট করিয়ে নিতে হবে। যদি লেখাটা মাপজোক মত বের করা যায় তাহলে একাডেমীতে প্রভাব-ট্রভাব তো একদিকে বাড়বেই, জোকা-তে সাহিত্য ভবন তৈরীর কাজটাও শুরু করে দিতে পারা যাবে।

বিভীষণের আসল নাম বিভাস সেন, কিন্তু বিভাস নামে বহুদিনই তাকে কেউ ডাকে না। অমর্ত্য সংলাপ প্রকাশ হয়েছিল আজ থেকে ষোল বছর আগে। সেই থেকেই বিভাস সেনের পাট চুকেছে। অমর্ত্য সংলাপ লেখা বন্ধুদের সঙ্গে বাজী রেখে, অতীনের পরামর্শ মত ছদ্মনামে। এরপর দুটো বছর খান দশেক গল্প, তারপর সরাসরি দেশে শারদীয়ায় উপন্যাস। বীথীর বাড়িতে প্রস্তাব দিলে ওর দত্ত ব্রাদার্সের কর্মচারী বাবা সাইকেল চালিয়ে গিয়ে খুব প্রসিদ্ধ দোকানের মিষ্টি কিনে নিয়ে এসেছিল। হাতিবাগানের সেই ঘুপচি ঘরে সেদিন অবশ্য বীথী আবার সেই সেন্টটা মেখেছিল।

মাছের গন্ধের সমস্যার শুরু তার আরো বছর দুয়েক পর। অনিল সরকার ভারতীতে চাকরির খবর নিয়ে এলেন, বেশ ভালো মাইনে, লেখালিখির প্রবাহ একটু কমবে কিন্তু তখন ওখানে প্রখ্যাত লেখক সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় কাজ করেন, তাঁর বৃত্তে ঘোরাফেরা করার সুফল অনেক। এই অযাচিত সুবিধের জন্য অনিল সরকারের একটা চাহিদা ছিল, এমনিতে খুব সামান্য চাহিদা কিন্তু তাঁর জন্য বিভাসকে শেষবেলায় গিয়ে অরুন্ধতীর প্রকাশককে গাড্ডায় ফেলতে হবে পূজোর লেখা না দিয়ে। চুক্তি মৌখিক, প্রকাশক বড়জোর একটা মামলা করতে পারে, সেটা অনিলের লোক সামলাবে। এতে ভারতীর আর বিভাসের দু’পক্ষেরই লাভ অপরিসীম। এসমস্ত কথা হচ্ছিল কসবার একটা ভাড়াবাড়ির ছোট্ট বারান্দায় বসে। কদিন গুমোটের পর সেদিন সকাল থেকে বৃষ্টি হয়েছে, অনিল সরকার ক্রমশঃ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছেন, আর বিভাস দেখতে পেল গলির মোড় দিয়ে নালু বাজারের ব্যাগ নিয়ে এদিকেই আসছে। নালুর আসাটা দেখে বিভাসের তখনই একেবারে পছন্দ হয়নি, নালু আদ্যন্ত মাছের গন্ধ নিয়ে কাদামাখা পায়ে বিভাসের খুব দরকারি বারান্দায় উঠে এসেছিল। বীথী খুব আনন্দ করে ইলিশ রান্না করতে করতে বলেছিল, কাল কালিঘাট হয়ে একবার বাড়ী যাব। বিভাসের কিছু করার ছিল না, নালুর কথামত চললে সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরাসরি প্রতিপক্ষে চলে যাওয়া-টাওয়া সেসব তো আছেই, তা ছাড়াও চাকরি বাকরি না করে খালি লেখা লিখে সংসার চালানোর এই ভয়ঙ্কর রাস্তাতেও নেমে পড়তে হয়। নালু বৃষ্টির বিকেলে বাচ্চাদের সঙ্গে মাঠে ফুটবল খেলে, বাজার থেকে সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে ইলিশ মাছ কিনে এনে, রাত্রে লিখতে বসার আইডিয়া দিতে পারে, কিন্তু সেটা বেজায় অনিশ্চিত আইডিয়া। খালিপেটে কালজয়ী উপন্যাস লেখা লিখতে গেলে নালুর মত ডাকাবুকো হতে হবে।

নালু যে আজকেও আসছে সেটা ওর নিশ্চিত ষড়যন্ত্র। বীথী অনেকদিন পরে আজ একটা মৃদু পারফিউম মেখেছে সেটাকে উপভোগ করতে দেবে না, প্রবন্ধ লেখাটাও ভেস্তে যেতে পারে। বিভীষণ খুব আস্তে করে চোখ তুলে, যেন এইমাত্র ভাতঘুম দিয়ে উঠল সেরকম ভীষণ একটা ম্যাড়মেড়ে চোখ তুলে নালুর দিকে তাকিয়ে বসে থাকল। নালু রোগা হয়ে গেছে খুবই, একটু কুঁজোও হয়েছে। আলপটকা এখানে সেখানে পা ফেলে ফেলে হেঁটে আসছে। নালু আসছে মানেই ফুটপাত থেকে কিছু শাক সবজি কিনে আনছে, মরসুমের সেরা সবজি নাকি ফুটপাতেই থাকে। আজকাল মাছ-টাছ আর আনতে পারে না। কিন্তু নালু আসলেই বিভীষণ অবিকল মাছের গন্ধ পায়। তারপর বীথী আসে পারফিউম মেখে। তারপরই বিভীষণের বমি পায়। কিন্তু নিজের বৌ-এর প্রসাধন আর আদর্শবান পুরুষের মেশানো গন্ধে, একটা খুব দরকারি কাগজের সামনে বসে অত সহজে বমিও তো করে ফেলতে পারা যায় না। নিজেকে সংযত করে বিভীষণ বলে, নালু তুমি আগে অনুকে রান্নাঘরে ওই ব্যাগে কি এনেছ সেটা দিয়ে এসো। আর একটু চা করতে বল তো। নালু উদ্ধতভাবে বলে, চা আর কি করে খাবেন। যা খাচ্ছেন তাই খান। বিভীষণ কিছু মনে করে না। নালু বরাবরই এরকম, রাগী, গোঁয়ার। যাক ও রান্নাঘরে গিয়ে অনুর সঙ্গে নানা দুঃখ, দুর্দশার কথা আলোচনা করতে করতে চা-টা খাক। এদিকে না এলেই হল, লেখাটা সময়মত নামাতে হবে।

প্রকাশ সিনহা আর বিভীষণের বহু আকাঙ্ক্ষিত সাহিত্য ভবন কিরকম জড়ামড়ি করে রয়েছে সেটা ভেবে একটু হাসিই পেল বিভাসের। সস্তা, সেরা সব্জীর ক্রেতা নালু এসব শুনলে আবার কি বলবে কে জানে। বাবার সম্পত্তির অংশ বেচে মৌলালির সেই কমিউনিস্ট ছোকরাদের সাহিত্য সংগঠনকে কিভাবে দাঁড় করিয়েছে সেসব উদাহরন দেবে মনে হয়। টাকার যোগাড়ের জন্য নিজের বইয়ের কমপ্লিমেন্টারি কপি চেয়ে এনে বিক্রি করে যে লোক, সে কি করে এসব পাঠ্যপুস্তক মার্কা সমাজসেবা করে বেড়ায় কে জানে। কিন্তু তার চেয়েও যেটা আশ্চর্যের সেটা হল নালুর মত লোক বিভীষণের বাড়ী আসে, এসে আবার নানা উপদেশ দেয়।

বীথী রেডি হয়ে গেছে, এবার নগর সৌন্দর্যায়নের একটা এনজিও-র মিটিং-এ যাবে। বীথী এসে সামনের সোফাটায় বসল, বিভাসের অনেকদিনের স্বপ্নের মত। সামনে সাজানো লেখার সরঞ্জাম, সামনে বীথী সেজেগুজে বসে আছে, একটা জরুরী মিটিং এ যাবে। এরকম সফল স্বপ্ন তো বিভাস দেখত সেই কবে থেকে। আর আজ বিভীষণ আর বীথী সেখানে বসে আছে। হালকা একটা পারফিউম মেখেছে আজ বীথী। বিভীষণের মনে হল জিজ্ঞাসা করে, আজ কোন স্পেশাল দিন কি না। কিন্তু বীথীর একটানা হাসি হাসি মুখ দেখে বিভীষণের কেমন যেন ঘোর কেটে গেল, হঠাৎ প্রশ্ন করল, বীথী তুমি আসল তো? বীথী হো হো করে হেসে উঠল। বলল, তোমার মনে আছে, শ্যামবাজারে একদিন বাস ফাঁকা হয়ে যেতে তুমি আমার পাশে বসে, হাতটা ঠেকিয়ে বলেছিলে, অনু তুমি আসল তো? বিভীষণ প্রচণ্ড চমকে গেল। রান্নাঘর থেকে নালুর হাসি শোনা যাচ্ছে। নালু খুব কম হাসে, কিন্তু আজ এরকম হাসছে কেন। মনে হচ্ছে যেন নালু খুব খুশি। বিভীষণ বীথীর দিকে অবাক চোখে তাকাতে তাকাতে উঠে পড়ল, ব্যাপারটা কি সেটা জানতে হবে। রান্নাঘরে একটা টিমটিমে বাল্ব জ্বলছে, পারফিউমের দামি গন্ধ আর নেই, তার বদলে রান্নাঘর থেকে একটা খুব ভালো শাক ভাজার গন্ধ আসছে। বিভীষণ শুনতে পেল, নালু হাসতে হাসতে বলছে, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আর তুমি যেন তারপর কি বলেছিলে? ভীষণ আগ্রহে বিভীষণ রান্নাঘরে দরজার একদম কাছে পৌঁছে ভিতরে সন্তর্পণে উঁকি দিল। নালু রান্নাঘরের মেঝেতে বসে আছে, অনু একটা পিড়ির উপর বসে রান্না করছে। চারদিকে দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট। এ তো বিভীষণের রান্নাঘর হতে পারে না। বিভীষণ বীথীর দিকে ঘুরে দেখল, চারদিকে আঁধার ঘনিয়েছে। দেয়াল থেকে প্লাস্টার খসে যাওয়া মলিন এক চিলতে বারান্দায়, গ্রিলে একটা শাড়ি শুকাচ্ছে। বীথীর চিহ্নমাত্র নেই। রান্নাঘর থেকে অনু বলল, আমি তো তখন তোমাকে তোমার ভালো নামে ডাকতাম, আমি হেসে ফেলে বলেছিলাম, বিভাসদা তুমি পাগল না তো?

বিভীষণ চিৎকার করে, ক্ষোভে ফেটে পড়ে, দেয়ালে মাথা ঠোকে, প্রতিবাদ করে। তারপর সব শান্ত হয়ে গেলে বিভীষণ নালুর কাছে এই সমস্ত অব্যবস্থার জবাব চায়।

No comments:

 
অবসরে । ২০১৪ ।